আজকাল ওয়েবডেস্ক: মিয়ানমারে সেনা-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (USDP) বড়সড় জয়ের দিকে এগোচ্ছে।এমনটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে সামরিক সরকারের আয়োজিত বিতর্কিত নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা সম্পন্ন হওয়ার পর। জাতিসংঘ এই নির্বাচনকে আগেই “ভাঁওতা” বা sham election বলে আখ্যা দিয়েছে, কারণ এটি না অবাধ, না সুষ্ঠু, না-ই বিশ্বাসযোগ্য। কার্যত কোনও অর্থবহ বিরোধী শক্তি ছাড়াই এই ভোটগ্রহণ চলছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় দফার ভোট দেন। এর আগে প্রথম দফার নির্বাচন হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর। সেখানে ভোটদানের হার ছিল মাত্র ৫২.১৩ শতাংশ যা ২০২০ ও ২০২৫ সালের নির্বাচনের তুলনায় অনেক কম। বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তাহীনতা, বিরোধী দলগুলির অনুপস্থিতি এবং জনগণের অনাস্থাই এই কম উপস্থিতির অন্যতম কারণ।

এটি ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন, যখন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ২০২০ সালের নির্বাচনে সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (NLD) নিরঙ্কুশ জয় পেলেও অভ্যুত্থানের পর দলটি ভেঙে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে বিলুপ্ত করা হয় অন্যান্য গণতন্ত্রপন্থী দলগুলিকেও। বর্তমান নির্বাচনে তাই কার্যত কোনও শক্তিশালী বিরোধিতা নেই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সেনাবিরোধী দলগুলি ভোট বয়কট করেছে।

নির্বাচনের শেষ দফা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি। এই দফায় দেশের ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ২৬৫টিতে ভোটগ্রহণ হবে এমন এলাকাতেও যেখানে সামরিক জুন্টার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। তবু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইউএসডিপি এবং সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ মিত্র দলগুলির জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র মিয়ানমার উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, “ইউএসডিপির জয় কার্যত নিশ্চিত এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। গোটা প্রক্রিয়াটাই এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে তাদের সুবিধা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এমন আইন চালু করা হয়েছে যা নির্বাচন বিরোধী কণ্ঠরোধ করে।”

অন্যদিকে, সামরিক জুন্টা দাবি করেছে এই নির্বাচন মিয়ানমারে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ এই দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে জুন্টার খুব একটা কাজে আসবে না।

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে হিংসা  ভয়াবহ আকার নিয়েছে। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট (ACLED)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে অন্তত ১৬,৬০০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসেব বলছে, প্রায় ৩৬ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া।

তবু সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং নির্বাচনকে সাফল্য বলে দাবি করেছেন। গত ডিসেম্বরে তিনি ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “প্রথম দফায় বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। তাই এই নির্বাচনকে সফল বলেই ধরা যায়।”

বাস্তবে যদিও মিয়ানমারের রাস্তায়-ঘাটে, গ্রাম ও শহরে ভিন্ন চিত্র, যুদ্ধ, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার  ছায়ায় ঢাকা এক দেশ, যেখানে ‘ভোট’ অনেকের কাছেই কেবল আরেকটি প্রহসন।