আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানে চলা যুদ্ধ শুধু মানবিক সঙ্কটই তৈরি করছে না, বরং বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে ইরানের তেল কাঠামোর ওপর হামলার ফলে বিশাল তেলের আগুন, বিষাক্ত ধোঁয়া এবং তথাকথিত “কালো বৃষ্টি” এখন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের সময় তেল ডিপো ও রিফাইনারিতে হামলা হলে তা পরিবেশে ব্যাপক দূষণ ছড়িয়ে দেয়।ইরানের রাজধানী তেহরানের আশপাশে একাধিক তেল সংরক্ষণাগারে হামলার পর আকাশজুড়ে বিশাল কালো ধোঁয়ার মেঘ তৈরি হয়েছে। অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, বাতাস এতটাই দূষিত হয়ে উঠেছে যে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘কালো বৃষ্টি’ কীভাবে তৈরি হচ্ছে
এই সংঘাতের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক পরিবেশগত ঘটনা হল “কালো বৃষ্টি”। তেল ডিপোতে আগুন লাগার পর বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া, কার্বন কণা এবং অপরিশোধিত হাইড্রোকার্বন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এই দূষিত কণাগুলো মেঘের সঙ্গে মিশে বৃষ্টির জলের সঙ্গে মাটিতে পড়ে, ফলে বৃষ্টির রং কালচে বা তৈলাক্ত হয়ে যায়।
এই বৃষ্টিতে থাকতে পারে সালফার যৌগ, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কালো কার্বন ও বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব কণা মানুষের ফুসফুসের গভীরে ঢুকে শ্বাসকষ্ট, চোখে জ্বালা, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, এই দূষিত বৃষ্টির কারণে মানুষের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা বাড়তে পারে এবং আক্রান্ত এলাকায় বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তেল আগুনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
তেলের আগুন শুধু বাতাসকেই দূষিত করে না; এটি মাটি ও জলকেও দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যখন বিপুল পরিমাণ তেল পোড়ে, তখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কালো কার্বন ও বিষাক্ত গ্যাস। এই কণাগুলো পরে মাটিতে জমে কৃষিজমি এবং জলের উৎসকে দূষিত করতে পারে।
ইতিহাস বলছে, যুদ্ধের সময় তেল কাঠামো ধ্বংস হলে পরিবেশগত ক্ষতি অনেক বছর ধরে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, গাল্ফ যুদ্ধ চলাকালে কুয়েতের শত শত তেলকূপে আগুন লাগানো হয়েছিল, যার ফলে বিশাল ধোঁয়ার মেঘ, দূষিত বৃষ্টি এবং সমুদ্র দূষণ দেখা দিয়েছিল। সেই দূষণের প্রভাব বহু বছর ধরে পরিবেশে থেকে গিয়েছিল।
সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকি
তেল কাঠামো ধ্বংস হলে তেল সমুদ্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি তেল পারস্য উপসাগর বা আশপাশের সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা মাছ, সামুদ্রিক পাখি ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র—ম্যানগ্রোভ বন, প্রবালপ্রাচীর এবং মাছের প্রজনন ক্ষেত্র—তেল দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে স্থানীয় মৎস্যশিল্প ও খাদ্য সরবরাহও বিপদের মুখে পড়তে পারে।
আঞ্চলিক পরিবেশ সঙ্কটের আশঙ্কা
বিজ্ঞানীরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট এই দূষণ শুধু ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাতাসের প্রবাহের কারণে বিষাক্ত ধোঁয়া ও কণা আশপাশের দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে সংঘাত শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক সঙ্কট নয়—এটি ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা অঞ্চলে বহু বছর ধরে অনুভূত হতে পারে।
