আজকাল ওয়েবডেস্ক: ১০ জানুয়ারি দুপুর গড়াতেই একের পর এক আতঙ্কিত বার্তা ভেসে উঠতে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রতিটি বার্তায় একই অনুরোধ, ইরানে থাকা প্রিয়জনের খোঁজ। “দয়া করে আমার মা-বাবাকে ইরানে ফোন করে জানাবেন আমি দুবাইয়ে নিরাপদে আছি”, এক তরুণীর আবেদন, সঙ্গে বাবা-মায়ের ফোন নম্বর। আরেকটি মেসেজ "দয়া করে আমার ভাইয়ের সঙ্গে তেহরানে যোগাযোগ করে দেখবেন, ও ঠিক আছে তো?” কেউ লিখছেন, “৪৮ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে, কোনও যোগাযোগ করতে পারছি না।”
এই সব আবেদন ভেসে আসে ইরানে ভারতীয় দূতাবাসের সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলে। দীর্ঘদিন কার্যত চুপ থাকার পর, ৮ জানুয়ারি ইরান জুড়ে ইন্টারনেট ও টেলিকম পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎই সক্রিয় হয়ে ওঠে ওই চ্যানেল। দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পরই এই কড়া পদক্ষেপ নেয় ইরান সরকার।
ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে, ৫ জানুয়ারি, ভারতের বিদেশমন্ত্রক ইরানে অপ্রয়োজনীয় সফর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছিল। যারা ইতিমধ্যেই সেখানে রয়েছেন, তাঁদের সতর্ক থাকতে, বিক্ষোভ এলাকা থেকে দূরে থাকতে এবং ভারতীয় দূতাবাসে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু আচমকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার ভারতীয় পরিবারের উদ্বেগ চরমে ওঠে। ইরানে থাকা চিকিৎসক ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, তীর্থযাত্রী ও অন্যান্য প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যায় এমন এক সময়ে, যখন দেশের ভেতরে পরিস্থিতি ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে আরও কঠোর নিরাপত্তা দমননীতির দিকে গড়ায়।
এই উৎকণ্ঠা আরও গভীর হয়েছে তাঁদের মধ্যে, যাঁরা গত বছরের জুনের সেই দুঃসহ দিনগুলো ভুলতে পারেননি। ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের সময় ‘অপারেশন সিন্ধু ’ চালু করে ভারত সরকার প্রায় সাড়ে তিন হাজার নাগরিককে ফিরিয়ে এনেছিল। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় বহু মেডিক্যাল ছাত্র তখন ফের ইরানে ফিরে যান। তাঁদের পরিবার ভেবেছিল, সবচেয়ে খারাপ সময়টা বুঝি পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নতুন করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেই পুরনো আতঙ্কই আবার ফিরে এসেছে।
দূতাবাসের গ্রুপে এক ব্যক্তি লিখেছেন, কোম শহরে থাকা প্রায় ৫০ জন ভারতীয় নাগরিকের খোঁজ চাইছেন তিনি। তাঁর ভাই ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সেখানে গিয়েছেন, কিন্তু এখনও স্থানীয় সিম পাননি। তিনি জিপিএস লোকেশন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, সব কিছু দিয়ে অনুরোধ করেছেন, কোনও খবর জানার জন্য।
ইয়াজদ শহর থেকে আরেকটি বার্তা- এক স্ত্রীর উদ্বেগ। তাঁর স্বামী আরও ছ’জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে সেখানে কাজ করেন। “৪৮ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে,” লিখেছেন তিনি, “কোনও খবর নেই।”
ইরানে ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রী। বিভিন্ন সূত্রের মতে, বর্তমানে ইরানে প্রায় ১৩ হাজার ভারতীয় ছাত্রছাত্রী মেডিক্যাল পড়াশোনা করছেন।
১০ জানুয়ারি ভারতীয় দূতাবাস একটি বিশেষ বার্তা দেয়, যেখানে জানানো হয় ইসফাহান, শিরাজ, কেরমান, তেহরানসহ একাধিক শহরের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদে আছেন। পরদিন আরও একটি আপডেট দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
১১ জানুয়ারি বিকেলে আবার সেই একই বার্তা পুনরাবৃত্তি করা হয়। জানানো হয়, ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও যারা ঘরের ভিতরে থাকছেন এবং বিক্ষোভ থেকে দূরে রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কোনও বিপদের খবর নেই।
কিছু পরিবারের কাছে এই বার্তা স্বস্তি আনলেও, যাঁদের সন্তান বা স্বজন অন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য শহরে রয়েছেন, তাঁদের উদ্বেগ কাটেনি। এক অভিভাবক ইসফাহান ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসে পড়ুয়া মেয়ের সহপাঠীদের নম্বর দিয়ে সাহায্য চান। কয়েক ঘণ্টা পর আবার লেখেন, “প্লিজ রিপ্লাই।”
আরেকজন জানান, তাঁর মেয়ে তেহরানের ইসলামিক আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সেমেস্টারের ছাত্রী। “গত ৬০ ঘণ্টা কোনও যোগাযোগ নেই,” লিখেছেন তিনি।
বার্তাগুলির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেহরান, ইসফাহান, শিরাজ, কোম, ইয়াজদ থেকে শুরু করে হরমোজগান প্রদেশের বান্দার-ই-বোস্তানুর মতো উপকূলবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে রয়েছে ভারতীয়দের উপস্থিতি।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই ওঠে এক বাস্তব প্রশ্ন “লোকাল ল্যান্ডলাইন কি কাজ করছে?” উত্তর অবশ্য হতাশাজনক। বহু এলাকায় সেগুলিও অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়েছে।
১১ জানুয়ারি নাগাদ ক্ষোভ বাড়তে থাকে দূতাবাসের চ্যানেল নিয়েও। কেউ কেউ দিল্লির বিদেশমন্ত্রকের ২৪×৭ কন্ট্রোল রুমে সরাসরি যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন, নম্বর ও ইমেল শেয়ার করেন।
একজন প্রশ্ন করেন, “আর কতদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকবে? কবে আমরা নিজেরাই সন্তানদের সঙ্গে কথা বলতে পারব?”
এর জবাব আসে এমন একজনের কাছ থেকে, যিনি ২০১৯ সালের ইরান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দেখেছেন। তিনি লেখেন, “কেউ জানে না… তখন ১৪ দিন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।”
ব্ল্যাকআউট তৃতীয় দিনে পা রাখতেই কিছু বার্তা আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। এক ব্যক্তি লেখেন, “পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। আমরা অনুরোধ করছি, ইরানে থাকা সব ভারতীয়কে সরিয়ে আনা হোক।” অন্যদেরও বার্তা ফরওয়ার্ড করার আহ্বান জানান তিনি।
এর মধ্যেই, ১১ জানুয়ারি গভীর রাতে, ইরানের ভেতর থেকেই আসে একটি বার্তা। আহওয়াজের এক ভারতীয় ছাত্র ইরাক সীমান্তে পৌঁছে ইরাকি সিম ব্যবহার করে জানান ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদ, কিন্তু রাত ৮টার পর বাইরে বেরোনো নিষেধ। ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত, শুধু ইন্টার্নশিপ করা ছাত্রছাত্রীদের ছাড়া।
এই বার্তাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার খবর যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনই বোঝায় স্বাভাবিক জীবন অনির্দিষ্টকালের জন্য থমকে গেছে।
আরও জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে ১৩ জানুয়ারি তেহরান-মুম্বই ইরান এয়ারের একটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন ১৪ জানুয়ারির শিরাজ-শারজাহ ফ্লাইট আদৌ হবে তো?
রবিবার পর্যন্ত ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধই ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এমনকি স্টারলিংক সংযোগও কার্যত অচল, সরকারি জ্যামিংয়ের কারণে।
এর মধ্যে অপেক্ষা আর উৎকণ্ঠাই ভরসা হাজার হাজার ভারতীয় পরিবারের। দূতাবাসের একটি আপডেট, কোনও অচেনা নম্বর থেকে আসা একটি বার্তাই হয়ে উঠছে একমাত্র আশার আলো।
