আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানে ধুন্ধুমার কাণ্ড। দেশের অর্থনৈতিক অবনতি এবং মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় নামেছেন হাজার হাজার দোকানদার। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন সাধারণ মানুষও। ক্রমশ এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। 
নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে দেশের চারটি শহরে এখনও সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সপ্তাহব্যাপী এই বিক্ষোভে গত বুধবার দু'জন এবং বৃহস্পতিবার পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

২০২২ সালের পর ইরানে এটাই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। সে বছর ২২ বছর বয়সী তরুণী মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়েছিল। হিজাব না পরার কারণে ইরানের নীতি পুলিশ আমিনিকে আটক করেছিল।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের খবর অনুযায়ী, সবচেয়ে হিংসার ঘটনা ঘটে ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের আজনা শহরে। অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিও'তে রাস্তায় জিনিসপত্রে আগুন লাগানোর দৃশ্য দেখা যায় এবং লোকজনকে 'লজ্জাহীন! লজ্জাহীন!' বলে স্লোগান দিতে শোনা যায়। লরদেগানে অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিও'তে একটি রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের দেখা যায় এবং গুলির শব্দও শোনা যায়।

সোশ্যাল মিডিয়ার সাইটগুলোতে ভাইরাল হওয়া ভিডিও'তে দেখা যায় যে কিছু বিক্ষোভকারী সশস্ত্র ছিল এবং তারা পুলিশদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত বেশ কয়েকটি যাচাইবিহীন ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদেরকে উর্দি পরা পুলিশ কর্তাদের দিকে পাথর ছুড়তে দেখা গিয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে যে, বিক্ষোভকারীরা গভর্নরের কার্যালয়, ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য সরকারি ভবনে পাথর নিক্ষেপ করে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

সিএনএন রাষ্ট্রীয়-অনুমোদিত গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বুধবার লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশতে বিক্ষোভ ক্রমশ হিংস্র হলে, ইরানের আধা-সামরিক বাহিনীর একজন সদস্য নিহত এবং ১৩ জন আহত হন। সংবাদ সংস্থাটি একটি ভিডিও সম্প্রচার করেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে যে, বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুন জখম একজন পুলিশ কর্তা চিকিৎসাধীন। এই আধা-সামরিক বাহিনীকে সাধারণত সরকার বিক্ষোভ দমনের জন্য মোতায়েন করে।

ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে বেশ কয়েকটি ইরানি শহরে দোকানদার, বাজারের ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে যোগ দিয়ে সরকার বিরোধী স্লোগান দিয়েছে। ইরান সরকার ঠান্ডা আবহাওয়ার কথা উল্লেখ করে বুধবার দেশজুড়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল। ইরানে সাপ্তাহিক ছুটি হল বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার, আর শনিবার ইমাম আলির জন্মদিন, যা অনেকের জন্য আরেকটি ছুটির দিন।

ইরানিরা কেন বিক্ষোভ করছে?
ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে দেশটির অর্থনৈতিক অবনতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং মুদ্রার বিনিময় মূল্য ওঠানামার কারণে। ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন হয়েছে। বর্তমানে এক ডলারের মূল্য প্রায় ১.৪ মিলিয়ন রিয়াল। মুদ্রার পতন এমনীতেই ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জন্য একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল। রিয়ালের পতনের ফলে ইতিমধ্যেই মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়েছে, যা ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে ৭২ শতাংশ বেড়েছে।

যদিও ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়নের কারণে ক্ষুব্ধ মোবাইল ফোন বিক্রেতারা এই বিক্ষোভ শুরু করে, তবে কিছু বিক্ষোভকারীকে দেশের ধর্মভইত্তিক সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতেও শোনা গিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন বিদেশ সচিব মাইক পম্পেও এই পরিস্থিতির জন্য ইরানের শাসনব্যবস্থার চরমপন্থা ও দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি এক্স-এ পোস্ট করেছেন, 'এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে ইরানের জনগণ ধসে পড়া অর্থনীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে... তাঁর (খামেইনি) নেতৃত্বে ইরানি শাসনব্যবস্থা চরমপন্থা ও দুর্নীতির মাধ্যমে একটি প্রাণবন্ত ও সমৃদ্ধ দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে... ইরানের জনগণের এমন একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রাপ্য, যা তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে - মোল্লা ও তাঁদের সহযোগীদের নয়।'

গত জুনে ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু করার পর ইরান এখনও সেই ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের কিছু পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়েছিল।

ইরান জানিয়েছে যে, তারা দেশের কোনও জায়গায়তেই আর ইউরেনিয়াম মজুত করছে না। এছাড়াও তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। যদিও, এখনও কোনও আলোচনা হয়নি।

এরানকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দিকে ঠেলে দিতে আয়াতুল্লাহ খামেইনি শাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'সর্বোচ্চ চাপ' কৌশলকার্যকর কেরছিল। কিন্তু সেই চাপই দেশটিকে প্রবল অর্থনৈতিক সংকটের দিকে নিয়েযেতে পারে। দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির মূলে রয়েছে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে আসা এবং ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর চাপ প্রয়োগের অভিযান।