আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ নিয়ে নতুন কৌশল ভাবছে ইরান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলবাহী জাহাজকে সীমিতভাবে এই প্রণালী দিয়ে যেতে দিতে পারে তেহরান, তবে একটি বিশেষ শর্তে—তেলের লেনদেন করতে হবে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে।


একজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইরান বর্তমানে এমন একটি কৌশল তৈরি করছে যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী দিয়ে কীভাবে তেলবাহী জাহাজ চলাচল করবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিশ্বজুড়ে যে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়, তার প্রায় ২০ শতাংশই এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে কোনও পরিবর্তন বা সীমাবদ্ধতা বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


বর্তমানে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের বেশিরভাগ লেনদেনই মার্কিন ডলারে হয়। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার পর সেই দেশের তেল অনেক সময় রুবল বা ইউয়ানে লেনদেন করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি ইউয়ানে লেনদেনের শর্ত আরোপ করে, তাহলে তা ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হতে পারে।


বিশ্ববাজারে ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে আশঙ্কা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং তা ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওই সময় রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর তেলের বাজারে বড় অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল।


এদিকে জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে যদি জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এর মানবিক প্রভাবও গুরুতর হতে পারে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল টম ফ্লেচার বলেছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব খুব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। তখন খাদ্য, ওষুধ, সারসহ নানা জরুরি পণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে উঠবে এবং সরবরাহের খরচও বেড়ে যাবে।


চীনের জন্যও এই প্রণালীর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন তার মোট তেল আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশ এই পথ দিয়েই পায়। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে বেইজিংয়ের জন্য হরমুজ প্রণালী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


এই উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে। তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে আসবে।


এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত আরও বাড়লে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপ তাদের জ্বালানি কাঠামোর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখান দিয়েই ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা হয়।

 


বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরান সত্যিই ইউয়ানে তেল লেনদেনের শর্ত আরোপ করে এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ শুরু করে, তাহলে তা বিশ্বের জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।