আজকাল ওয়েবডেস্ক: হোয়াইট হাউস বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে ইরানে সরকার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ৮০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

ক্যারোলিন লিভিট জানান, বুধবার এই ৮০০ জনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের 'বন্ধু' দেশগুলোর প্রবল চাপের মুখে ইরান পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে। গত ২০ দিন ধরে চলা তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা যে নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে, এই সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

হোয়াইট হাইস সতর্ক করে দিয়েছে যে, তেহরান দেশব্যাপী সরকার বিরোধী বিক্ষোভ বন্ধ করতে হিংসাত্মক দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে ২,৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, এবং এই পরিস্থিতিতে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প এখনও খোলা আছে।
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর দল ইরানি শাসকদের সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছে এবং পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ডগুলোকে বিক্ষোভকারীদের ওপর 'হিংসাত্মক দমন' বলে তোপ দেগেছে।

আমেরিকা বিক্ষোভকারীদের ওপর হিংসাত্মক দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচজন ইরানি কর্মকর্তার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ঠিক সেই সময়েই হোয়াই হাউজের ইরান নিয়ে প্রতিক্রিয়া বেশ তাৎপর্যবাহী। রয়টার্স জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ইরানি নেতাদের বিদেশে ব্যাহ্কগুলোতে আর্থিক লেনদেন ট্র্যাক করার পদক্ষেপও শুরু করেছে। যা তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর এক কৌশল।

প্রেস সেক্রেটারি বলেন, বিক্ষোভ-সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে ট্রাম্প তেহরানকে "মারাত্মক পরিণতির" বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

লেভিটের মতে, ট্রাম্প ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ইরানি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছেন যে মৃত্যুদণ্ড ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর দল ইরানি সরকারকে জানিয়েছে যে, যদি হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে, তবে এর গুরুতর পরিণতি হবে।” এবং যোগ করেন যে ট্রাম্পকে বলা হয়েছে "হত্যা ও মৃত্যুদণ্ড" বন্ধ করা হবে।

ট্রাম্প বলেছেন ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করেছে:
এর আগে, কয়েক দিনের হুমকি, সতর্কতা এবং উত্তেজনা বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান আশঙ্কার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করা হয়েছে।

এই মন্তব্যগুলো ২৬ বছর বয়সী ইরানি বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগের পর এসেছে, যাকে এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে আটক করার পর অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আটক বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির পরিবার জানিয়েছে যে তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে, যদিও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি।

ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁকে জানানো হয়েছে যে বিক্ষোভ-সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড উভয়ই বন্ধ করা হয়েছে, কোনও ফাঁসি হবে না।

ইরান ফাঁসির পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে:
যদিও ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ফাঁসি রদের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তেহরান বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িতদের ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাকচি বলেন, "ফাঁসির কোনও পরিকল্পনা নেই।" এবং তিনি আরও বলেন যে এই ধরনের শাস্তি "প্রশ্নাতীত"।

উল্লেখ্য, ঐতিহাসিকভাবে ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অন্যতম একটি পদ্ধতি হল ফাঁসি।

ইরানের ইতিহাসে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ৪৭ বছরের শাসনকালে এবারের মতো এত বড় ও ব্যাপক গণআন্দোলন আগে কখনও দেখা যায়নি। মূলত দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং মুদ্রার চরম অবমূল্যায়নই এই বিক্ষোভের প্রধান কারণ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ রিয়াল। এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক পতনের ফলে ইরানে খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা জনগণকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।

বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট থেকে। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ের প্রতিবাদে শুরু হওয়া সেই ধর্মঘট মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দাবানলের মতো ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় প্রতিটি শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে এবং পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। সশস্ত্র সংঘাত ও দমনে এ পর্যন্ত ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।

বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর একাধিক হুমকি দিয়েছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৮০০ বিক্ষোভকারীর ফাঁসি স্থগিতের মাধ্যমে ইরান কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা সরাসরি মার্কিন হামলার আশঙ্কাকে আপাতত কমিয়ে আনতে পারে। 

যদিও ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা এখনও অত্যন্ত অস্থির এবং বিক্ষোভকারীরা পুরো দেশকে অচল করে রেখেছেন, তবুও এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা পাওয়াকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।