আজকাল ওয়েবডেস্ক: সালের ইসলামি বিপ্লব ইরানের রাষ্ট্র কাঠামোকে যেমন বদলে দিয়েছিল, তেমনই তা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল দেশের মহিলাদের জীবনযাত্রা, সামাজিক উপস্থিতি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে। এই পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে পোশাক, জনজীবনে অংশগ্রহণ এবং নারী–পুরুষ সম্পর্কের রূপান্তরের ভেতর দিয়ে।
বিপ্লবের আগে, বিশেষ করে ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে, ইরানের শহুরে সমাজে মহিলারা তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান ছিলেন। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে মহিলা শিক্ষার্থীদের কাজ করা, শহরের রাস্তায় জিন্স, মিনিস্কার্ট কিংবা আধুনিক পোশাকে নারীদের হাঁটাচলা, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শুক্রবারের পিকনিকে পুরুষ-নারীর একসঙ্গে সময় কাটানো, এসব ছিল সেই সময়ের পরিচিত দৃশ্য। যদিও হিজাব তখনও সমাজে প্রচলিত ছিল, তা ছিল মূলত ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা নয়। চুল কাটার সেলুনে নারী–পুরুষের মেলামেশা কিংবা খেলাধুলার মাঠে নারীদের উপস্থিতিও তৎকালীন শহুরে সংস্কৃতির অংশ ছিল।
তবে এই দৃশ্যমান আধুনিকতার আড়ালেও সমাজে অসন্তোষ জমছিল। শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভির শাসনকালে রাজকীয় বিলাসিতা এবং পশ্চিম ঘেঁষা নীতির বিরুদ্ধে বামপন্থী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। ১৯৭১ সালে পারস্য সাম্রাজ্যের ২,৫০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ব্যয়বহুল উৎসব সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তোলে, যা পরবর্তী বিপ্লবের সামাজিক প্রেক্ষাপট গড়ে দেয়।
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর এই চিত্র দ্রুত বদলে যায়। ক্ষমতায় আসার পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ঘোষণা করেন যে সব মহিলাকে জনসমক্ষে হিজাব পরতে হবে ধর্ম বা জাতীয়তা নির্বিশেষে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ৮ মার্চ ১৯৭৯-এ হাজার হাজার নারী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানালেও সেই আন্দোলন টেকেনি। ধীরে ধীরে বাধ্যতামূলক পোশাক বিধি ইরানি রাষ্ট্রের পরিচয়চিহ্ন হয়ে ওঠে।
https://www.youtube.com/shorts/eeN4DpaV7u0
এরপরের দশকগুলোতে ইরানি মহিলাদের জীবন গড়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণ ও অভিযোজনের ভেতর দিয়ে। একদিকে কালো চাদর, ঢিলেঢালা কোট ও মাথা ঢাকা স্কার্ফ হয়ে ওঠে জনজীবনের নিয়ম; অন্যদিকে ঘরের ভেতর, বিয়ের অনুষ্ঠানে কিংবা মহিলা-নিয়ন্ত্রিত পরিসরে মহিলারা নিজেদের পছন্দের পোশাক পরেই চলেছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রথম দিকে বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা হলেও সামাজিক চাপের মুখে সরকার মহিলাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সুযোগ দিতে বাধ্য হয়। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট প্রতিরোধও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্কার্ফ কতটা পেছনে সরানো যাবে, মেকআপ কতটা দেখা যাবে, এসব নিয়েই গড়ে ওঠে নীরব প্রতিবাদের ভাষা। সমুদ্র সৈকতে নারীদের পুরো শরীর ঢাকা পোশাকে নামতে হলেও অনেকেই উপায় খুঁজে নেন আলাদা জায়গায় সাঁতার কাটার। ফুটবল ম্যাচে প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলেও মহিলারা দূর থেকে কিংবা বিকল্প উপায়ে খেলা দেখার চেষ্টা চালিয়ে যান।
তবে ইরানি মহিলাদের অভিজ্ঞতা সোজাসাপ্টা নয়। বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরোধিতার পাশাপাশি এমন মহিলাও আছেন যারা এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন। ২০০০-এর দশকে তেহরানে হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবিতে মহিলাদের অংশগ্রহণে মিছিল তারই প্রমাণ। অর্থাৎ ইরানি সমাজে নারী পরিচয় নিজেই নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে।
আজকের ইরানে নারী শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সাংস্কৃতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পোশাক ও জনজীবনের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখনো বজায় আছে। ইসলামি বিপ্লবের আগে যে স্বাধীনতা ছিল দৃশ্যমান ও প্রকাশ্য, তা আজ অনেক বেশি সংযত ও নিয়ন্ত্রিত। তবু সেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ইরানি নারীরা প্রতিদিন নতুন করে নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন, নীরবে, ধীরে, কিন্তু অবিচলভাবে।
