আজকাল ওয়েবডেস্ক: পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে আল-কায়েদার শীর্ষনেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার অভিযানের পর সবচেয়ে কঠিন অভিযান চালিয়েছে মার্কিন সেনা। এই অভিযানেই ঘর থেকে আটক করা হয় ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি পোস্টে এই অভিযানের কথা জানান। তিনি বলেন, “ভেনেজুয়েলারপ্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর এবং তার স্ত্রীকে আটক করে দেশ থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”

এরপরে তাঁদের নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। সোমবার আদালতে হাজির করানো হয়। যদিও মাদক পাচার ও অন্যান্য অভিযোগে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন মাদুরো। আদালতে হাজির হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর মাদুরোর প্রাক্তন ডেপুটি ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। এই অভিযানের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ফের প্রমাণ করেছে যে, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক এবং সময় যতই কম থাকুক না কেন, তারা কী করতে সক্ষম। 

বিশেষ অভিযান বাহিনী

আমেরিকার অন্যতম দক্ষ এবং পারদর্শী ডেল্টা ফোর্স এই অভিযান চালিয়েছিল। ডেল্টা ফোর্স যে মিশনগুলো পরিচালনা করে তার বেশিরভাগই গোপনীয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধুমাত্র কয়েকটি অভিযান জনসমক্ষে এসেছে। ডেল্টা ফোর্সের কিছু বিখ্যাত অভিযানের মধ্যে রয়েছে অপারেশন প্রাইম চান্স, ২০০১ সালে বিন লাদেনকে খোঁজার অভিযান, বাগদাদ বিমান হামলা, ইরাকে বন্দি উদ্ধার অভিযান, অপারেশন গথিক সার্পেন্ট (সোমালিয়া), অপারেশন আর্জেন্ট ফিউরি (গ্রেনাডা), এবং আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদির বিরুদ্ধে অভিযান।

এই অভিযানে ১৬০তম এসওএআর বা স্পেশাল অপারেশনস এভিয়েশন রেজিমেন্টকেও ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি একটি বিশেষ অভিযান বাহিনী যারা রাতের অভিযানে দক্ষতার জন্য পরিচিত। এছাড়াও চিনুক, ব্ল্যাক হক ও লিটল বার্ড হেলিকপ্টার ব্যবহারে পারদর্শী।

১৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক অভিযানে বি-১ ল্যান্সার, এফ-২২ র্যাপ্টর, এফ-৩৫ লাইটনিং টু, এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট, ইএ-১৮ গ্রোলার এবং ই-২ হকআই-এর মতো যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছিল।

আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল ড্রোন, যা ‘রেইথ’ বা ‘দ্য বিস্ট অফ কান্দাহার’ নামে পরিচিত। এটি একটি আমেরিকান চালকবিহীন আকাশযান (ইউএভি) যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং পুনরুদ্ধার (ISTAR) অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই স্টেলথ বিমানটি সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী (ইউএসএএফ) দ্বারা পরিচালিত।

সিআইএ দল

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আগস্ট মাস থেকে সিআইএ-র একটি ছোট দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। দলটি মাদুরোর জীবনযাত্রার ধরণ সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেছিল। যার ফলে তাঁকে আটক করার প্রক্রিয়াটিকে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থাটির মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন গুপ্তচরও ছিল। যে তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত এবং অভিযানটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য প্রস্তুত ছিল। জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী দলের সদস্যদের বয়সসীমা ছিল ২০ থেকে ৪৯ বছর।

ইউএসএস আইও জিমা

মাদুরোকে প্রথমে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তারপর একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন আক্রমণকারী জাহাজ ইউএসএস আইও জিমার মাধ্যমে নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত করা হয়। 

ইউএসএস আইও জিমা (LHD-7)মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বিশাল জাহাজ। এটি একটি ছোট বিমানবাহী রণতরীর মতো কাজ করে। এটি ৮৪০ ফুট লম্বা এবং এর ফ্লাইট ডেক ১৪০ ফুট চওড়া। জাহাজটি মেরিন সেনা, হেলিকপ্টার, জেট বিমান এবং নৌকা বহন করতে পারে, যা এটিকে সরাসরি উপকূলে সৈন্য ও যানবাহন নামানোর সুযোগ করে দেয়। জাহাজটিকে জল এবং স্থলে উভয় স্থানে আক্রমণের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। যার অর্থ এটি দ্রুত সমুদ্র থেকে স্থলে সৈন্য স্থানান্তর করতে পারে।

ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী ঘোষণা করেছে যে মাদুরোকে আটক করার জন্য মার্কিন সামরিক অভিযানে অন্তত ২৪ জন নিরাপত্তা আধিকারিক নিহত হয়েছেন। যার ফলে সরকারি মৃতের সংখ্যা অন্তত ৫৬ জনে পৌঁছেছে। ভেনেজুয়েলার অ্যাটর্নি জেনারেল তারেক উইলিয়াম সাব মঙ্গলবার বলেছেন যে ‘কয়েক ডজন’ আধিকারিক ও অসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। প্রসিকিউটররা এই মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করবেন। তিনি এটিকে একটি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কিউবার সরকারের তথ্য অনুসারে, ভেনেজুয়েলার ২৪ জন নিরাপত্তা আধিকারিক ছাড়াও, ভেনেজুয়েলায় কর্মরত ৩২ জন কিউবান সামরিক ও পুলিশকর্তাও নিহত হয়েছেন। যার ফলে ক্যারিবীয় দ্বীপটিতে দু’দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।