আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য হয়ে ছিল আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত বারমুডা দ্বীপ। চারপাশের সমুদ্রতলের তুলনায় এত উঁচুতে কীভাবে টিকে রয়েছে এই দ্বীপ, তা নিয়ে ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে ছিল বিস্তর কৌতূহল। কারণ বারমুডার আগ্নেয়গিরিগুলি প্রায় ৩ কোটি বছর আগেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এতদিনে দ্বীপটির ধীরে ধীরে সমুদ্রতলের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। এবার মার্কিন বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা সেই রহস্যের সম্ভাব্য উত্তর সামনে আনল।


নতুন গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন কার্নেগি সায়েন্সের ভূকম্পবিদ ইউলিয়াম ফ্রেজার এবং জেফ্রি পার্ক। তাঁদের মতে, বারমুডার নীচে এমন এক বিশেষ ভূতাত্ত্বিক গঠন রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি।


সাধারণত হাওয়াইয়ের মতো আগ্নেয় দ্বীপগুলি তৈরি হয় ‘ম্যান্টল প্লুম’-এর মাধ্যমে। পৃথিবীর গভীর ম্যান্টল স্তর থেকে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও হালকা শিলা উপরে উঠে এসে আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়ায় সমুদ্রতলও ফুলে ওঠে। পরে টেকটোনিক প্লেট সরে গেলে আগ্নেয় কার্যকলাপ কমে যায় এবং ধীরে ধীরে সেই অংশ আবার নীচে নেমে যায়। কিন্তু বারমুডার ক্ষেত্রে সেই নিয়ম কার্যকর হয়নি।


বর্তমানেও বারমুডা আশপাশের সমুদ্রতলের তুলনায় প্রায় ১,৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থান করছে। এই অস্বাভাবিক ঘটনার কারণ জানতে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বিভিন্ন বড় ভূমিকম্প থেকে তৈরি হওয়া সিসমিক তরঙ্গ বিশ্লেষণ করেন। এই তরঙ্গ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন ঘনত্বের শিলার কারণে কখনও দ্রুত, কখনও ধীরে চলাচল করে। সেই তথ্য ব্যবহার করে গবেষকরা বারমুডার নীচে প্রায় ২০ মাইল গভীর পর্যন্ত ভূগর্ভের একটি চিত্র তৈরি করেন।


গবেষণায় দেখা যায়, সমুদ্রতলের ভূত্বকের ঠিক নীচে প্রায় ১২ মাইল পুরু একটি বিশেষ শিলাস্তর রয়েছে। এই শিলা আশপাশের ম্যান্টলের তুলনায় অনেক কম ঘনত্বের, ফলে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি ভাসমান। বিজ্ঞানীদের মতে, এই হালকা শিলাস্তর এক ধরনের ভেলার মতো কাজ করছে, যা বারমুডা ও তার আশপাশের সমুদ্রতলকে ভাসিয়ে রেখেছে।


গবেষকদের ধারণা, কোটি কোটি বছর আগে বারমুডার আগ্নেয় অতীতের সময় কার্বনসমৃদ্ধ শিলা ভূত্বকের নীচে প্রবেশ করে ঠান্ডা হয়ে জমাট বেঁধেছিল। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই উপাদানের উৎপত্তি সম্ভবত পৃথিবীর গভীরে, সুপারকন্টিনেন্ট প্যাঞ্জিয়ার গঠনের সময়।

 

&t=1s
উইলিয়াম ফ্রেজারের মতে, বারমুডার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য প্রচলিত ম্যান্টল প্লুম তত্ত্বের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তাই পৃথিবীর গভীরে আরও জটিল ও অজানা প্রক্রিয়া কাজ করছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এখন তাঁরা বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের নীচেও একই ধরনের গঠন রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছেন। এই গবেষণা শুধু বারমুডার রহস্যই উন্মোচন করেনি, বরং পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন এবং ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন সম্পর্কে নতুন প্রশ্নও তুলে দিয়েছে বিজ্ঞানমহলে।