আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর মূলধারার রাজনীতির প্রতি অনাস্থাকে হাতিয়ার করে নেপালের মসনদে বসেই ‘নতুন ব্যবস্থা’র ডাক দিলেন দেশটির কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী, ৩৫ বছর বয়সী বলেন্দ্র শাহ। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম সপ্তাহেই তাঁর সরকারের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে। শুধু তাই নয়, তিন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের তদন্ত শুরু করে হিমালয় কন্যা নেপালের রাজনীতিতে কার্যত ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছেন এই তরুণ নেতা।

গত ৫ মার্চের নির্বাচনে বলেন্দ্র শাহের ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (RSP) ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টি জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যা নেপালের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দলগুলোকে কোণঠাসা করে দিয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যে ‘জেন-জি’ অভ্যুত্থানে ৭৬ জনের প্রাণ গিয়েছিল, সেই রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়েই ক্ষমতায় এসেছেন শাহ। গত ২৭ মার্চ শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, সেপ্টেম্বরের সেই হিংসার ঘটনায় অপরাধীদের ছাড়া হবে না। প্রাক্তন বিশেষ আদালত বিচারক গৌরী বাহাদুর কার্কির নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয় নতুন মন্ত্রিসভা। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ওলি এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অবহেলার অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

পরের দিন সকালেই নেপাল পুলিশ ওলি ও লেখককে গ্রেপ্তার করে কাঠমান্ডু জেলা আদালতে পেশ করে। আদালত তাঁদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। যদিও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওলিকে বর্তমানে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে রেখে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ওলির দল সিপএন (ইউএমএল) দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়ে একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে। নেপালি কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলোও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে সিলেক্টিভ হওয়ার অভিযোগও উঠেছে—কেননা ৮ সেপ্টেম্বরের পুলিশি অভিযানের তদন্ত হলেও ৯ সেপ্টেম্বরের সংসদ ভবন বা সুপ্রিম কোর্টে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এখনও তেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সরকার এ বিষয়ে নতুন প্যানেল গঠনের আশ্বাস দিয়েছে।

জবাবদিহিতার এই লড়াই কেবল রাজনৈতিক গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা পূর্ণাঙ্গ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে রূপ নিয়েছে। অর্থপাচারের অভিযোগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি, পুষ্প কমল দাহাল (প্রচণ্ড) এবং শের বাহাদুর দেউবার বিরুদ্ধে মামলা পুনরায় চালু করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ওলি সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী দীপক খাড়কাকেও। ১৯৯০ সালের পর থেকে যারা জনসেবার পদে ছিলেন, তাঁদের সবার সম্পত্তির উৎস খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (FATF)-এর ‘গ্রে লিস্ট’ থেকে বেরোতে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে শাহ সরকার এই কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে দ্রুত প্রশাসনিক সংস্কার এবং ডিজিটাল শাসনের লক্ষ্যে ১০০টি কাজের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও, বলেন্দ্র শাহের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের দাম ও মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পশ্চিম এশিয়ায় আটকে থাকা নেপালি শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতেও সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে বেসরকারি খাতকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন ঠিকই, তবে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটানোই হবে বড় পরীক্ষা। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল স্পষ্ট করেছেন যে, নেপাল অসংলগ্ন নীতি এবং সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতেই বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করবে। নেপালের এই আমূল পরিবর্তন এবং তরুণ নেতৃত্বে নতুন পথচলার দিকে এখন তাকিয়ে আছে গোটা দক্ষিণ এশিয়া।