আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরান জুড়ে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে বিক্ষোভ। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলেও চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন “খুবই কঠোর কিছু বিকল্প” বিবেচনা করছে। তাঁর কথায়, পরিস্থিতি প্রতি ঘণ্টায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিক্ষোভ দমনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবছে। এমনকী সামরিক স্তরেও সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প জানান, ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকে বসতে আগ্রহী হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইরানের বিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গেও তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন HRANA জানিয়েছে, গত দু’সপ্তাহে ইরানে অন্তত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০,৬০০-র বেশি মানুষ। ২০২২ সালের পর এই আন্দোলনকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর মধ্যেই তেহরান থেকে এসেছে কড়া হুঁশিয়ারি। ইরানের সংসদের স্পিকার মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে “ভুল হিসাব” না করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ইরানে হামলা হলে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি এবং যুদ্ধজাহাজ ইরানের বৈধ লক্ষ্য হবে। ঘালিবাফ নিজে একসময় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন।

বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে। কিন্তু খুব দ্রুতই তা রূপ নেয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে বড়সড় গণআন্দোলনে। ইরানের সরকার এই আন্দোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে এবং সোমবার দেশজুড়ে পাল্টা সমাবেশ ডাকার আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি সংবাদমাধ্যমে এই বিক্ষোভকে “আমেরিকা ও ইসরায়েল পরিচালিত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

গত পাঁচ দিন ধরে ইরানে কার্যত ইন্টারনেট বন্ধ। ফলে দেশের ভিতরের পরিস্থিতি নিয়ে খবর পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ইরানে ইন্টারনেট পরিষেবা ফেরাতে তিনি স্পেসএক্স কর্তা এলন মাস্কের সঙ্গে স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের বিষয়ে কথা বলতে পারেন। “আমরা বিষয়টা নিয়ে কথা বলছি। ইন্টারনেট চালু করার চেষ্টা হতে পারে। আমি এলন মাস্ককে ফোন করব,” বলেন ট্রাম্প।

এদিকে ইরানের শেষ শাহের পুত্র ও নির্বাসিত বিরোধী নেতা রেজা পাহলভি ট্রাম্পের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যেন বিক্ষোভকারীদের পাশে থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে না আসে। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাহলভি বলেন, “আপনি শান্তির মানুষ হিসেবে ইতিমধ্যেই একটি উত্তরাধিকার গড়েছেন। আপনার সমর্থনের কথায় ইরানের মানুষ সাহস পাচ্ছে। তারা জানে আপনি তাঁদের ছেড়ে যাবেন না, যেমনটা ওবামা বা বাইডেন করেছিলেন। এই শাসন পতনের পর ইরানের মানুষই হবে আমেরিকার সেরা অংশীদার।”

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তেহরানের রাস্তায় রাতের অন্ধকারে মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। কোথাও শোনা যাচ্ছে স্লোগান, কোথাও আগুনের ধোঁয়া। উত্তর-পূর্বের শহর মাশহাদ থেকে আসা ফুটেজে রাস্তায় জ্বলন্ত আগুন, মুখোশ পরা বিক্ষোভকারী এবং দূরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

ইরানের রাজপথে এই অস্থিরতা এখন শুধু দেশের ভিতরের বিষয় নয়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক সব কিছুর উপরেই এর প্রভাব পড়তে চলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।