আজকাল ওয়েবডেস্ক: পাকিস্তানি ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী হিনা বালোচের একটি সাম্প্রতিক ভিডিও সাক্ষাৎকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ‘কুইয়ার গ্লোবাল’ নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে হিনা দাবি করেছেন যে, পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ সমকামী এবং বাকি ২০ শতাংশ উভকামী। তার মতে, দেশটির কেউই প্রকৃতপক্ষে ‘স্ট্রেইট’ বা বিপরীতকামী নয়। হিনার এই মন্তব্য পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সাক্ষাৎকারটিতে হিনা বালোচ পাকিস্তানের যৌনতাকে একটি ‘খোলা রহস্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সামাজিক চাপ, ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা এবং পারিবারিক সম্মানের ভয়ে মানুষ তাদের প্রকৃত যৌন পরিচয় গোপন রাখে। হিনা জোর দিয়ে বলেন, মানুষ জনসমক্ষে এই সত্য অস্বীকার করবে এবং ধর্ম বা সংস্কৃতির দোহাই দেবে, কিন্তু পর্দার আড়ালের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। তিনি নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার কথা টেনে বলেন যে, পাকিস্তানের সমাজে সমকামিতা অত্যন্ত প্রবল হলেও তা স্রেফ স্বীকার করা হয় না।

নিজের জীবনের সংগ্রাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হিনা জানান, ছোটবেলায় তার কাছে নিজের যৌন পরিচয়ের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল লিঙ্গ প্রকাশ বা জেন্ডার এক্সপ্রেশন। তিনি বলেন, “আমার মূল দুশ্চিন্তা ছিল কীভাবে ঠোঁটে লিপস্টিক দেব আর পরিবারের গালিগালাজ থেকে বাঁচব। কীভাবে মেয়েদের মতো পোশাক বা গয়না পরব অথচ মার খেতে হবে না, সেটাই ছিল আসল লড়াই।” এই ব্যক্তিগত লড়াই থেকেই তিনি পরবর্তীতে অধিকার আদায়ের পথে পা বাড়ান।

পাকিস্তানের ‘খাজা সিরা’ বা ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের দুর্দশা নিয়েও হিনা বেশ জোরালোভাবে কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে এই সম্প্রদায়ের মানুষদের ভিক্ষাবৃত্তি, নাচ কিংবা যৌনকর্মের মতো সীমিত ও শোষণমূলক পেশায় বাধ্য করা হয়। এই প্রথা ভাঙার লক্ষ্যেই তিনি পাকিস্তানে ‘সিন্ধু মুরাত মার্চ’ এবং ‘অওরত মার্চ’-এর মতো আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

তবে অধিকার আদায়ের এই পথ হিনার জন্য সহজ ছিল না। তিনি জানান, একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ‘প্রাইড ফ্ল্যাগ’ বা রংধনু পতাকা ওড়ানোর পর তাকে চরম হিংসার শিকার হতে হয়েছিল। এমনকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাও তিনি তুলে ধরেন। জীবনের ঝুঁকির মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান ছাড়তে বাধ্য হন। বর্তমানে হিনা বালোচ লন্ডনের সোয়াস (SOAS) বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছেন এবং যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তার এই সাহসী বক্তব্য একদিকে যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, অন্যদিকে রক্ষণশীল মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছে।