আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৫ সালে পাকিস্তানের জন্য গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। আগের বছরগুলির তুলনায় সংঘাতজনিত কারণে মৃত্যুর হার ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (পিআইসিএসএস)-এৎ তথ্য অনুসারে, এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর কারণ ছিল আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং আফগান জঙ্গিদের মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহার, পাশাপাশি পাকিস্তানি তালিবান এবং বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-এর মতো সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। পিআইসিএস-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় ৩,৪১৩ জন নিহত হয়েছেন। যা ২০২৪ সালের ছিল ১,৯৫০ জন।

নিজের অস্ত্রেই ঘায়েল

১৯৪৭ সাল থেকে পাওয়া রেকর্ড অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) ভারতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহারের একটি ধারাবাহিক কৌশল অবলম্বন করে আসছে। কয়েক দশক ধরে ইসলামাবাদকে তালিবানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে গণ্য করা হত। ১৯৯০-এর দশকে এই গোষ্ঠীটির উত্থানের পর থেকে তাদের আশ্রয় ও সহায়তা দিয়ে আসছিল পাকিস্তান। 

১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তান ছিল তালিবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া তিনটি দেশের মধ্যে একটি। ২০০১ সালে সম্পর্ক ছিন্নকারী শেষ দেশটিও ছিল এটি। মার্কিন আগ্রাসনের পর ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে তালিবান জঙ্গিদের সাহায্য করার এবং তাদের পুনর্গঠনের জন্য নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

কিন্তু ২০২২ সালে বিষয়টি পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে যায়। ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি তালেবান জঙ্গিদের সীমান্ত হামলার বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ না করার অভিযোগ তোলে। আফগানিস্তানের তালিবান সরকার তা অস্বীকার করেছে। অক্টোবর মাসে সীমান্ত সংঘর্ষে বেশ কয়েক জন নিহত এবং শত শত আহত হন। তারপর থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে।

মার্কিন অস্ত্র

পিআইসিএসএস-এর মতে, সন্ত্রাসজনিত ঘটনায় নিহত ৩,৪১৩ জনের মধ্যে ২,১৩৮ জন জঙ্গি।  রিপোর্টে বলা হয়েছে, জঙ্গিদের মৃত্যুর সংখ্যায় ১২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের ফল।

আত্মঘাতী হামলা মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ছবি: সংগৃহীত।

পিআইসিএসএস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ খান বলেছেন, এই উচ্চ মৃত্যুর সংখ্যার জন্য আংশিকভাবে আত্মঘাতী বোমা হামলার বৃদ্ধি এবং ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় ফেলে যাওয়া মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম জঙ্গিদের হাতে চলে যাওয়া দায়ী। যা পরে পাকিস্তানি তালিবান এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছয় এবং তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু বৃদ্ধি

আবদুল্লা আরও জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের নিহতদের মধ্যে ৬৬৭ জন নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন। যা ২০২১ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি এবং ২০১১ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। এছাড়াও, ৫৮০ জন অসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। যা ২০১৫ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। সরকারপন্থী শান্তি কমিটির ২৮ জন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

পিআইসিএসএস ২০২৫ সালে অন্তত ১,০৬৬টি জঙ্গি হামলা রেকর্ড করেছে এবং আত্মঘাতী হামলা ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ২৬টি ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী গত বছর অভিযানে প্রায় ৫০০ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০২১ সালে যা ছিল ২৭২ জন। আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) সহ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী ২০২৫ সালের বেশিরভাগ হামলার দায় স্বীকার করেছে।

পাক-আফগান সংঘাত বৃদ্ধি

পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরীফ চৌধুরী জানিয়েছিলেন,  নিরাপত্তা বাহিনী ২০২৫ সালে ৬৭,০২৩টি অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযানের ফলে ১৩৬ জন আফগান নাগরিক-সহ ১,৮৭৩ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। এই ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পরেই পিআইসিএসএস রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।

৯ অক্টোবর কাবুলে বিস্ফোরণের ঘটনার পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্তে হিংসা শুরু হয়। এই হিংসার জন্য আফগান তালিবান সরকার পাকিস্তানকে দায়ী করেছিল। এরপর থেকে কাতারের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। যদিও ইস্তানবুলে তিন দফা আলোচনা সত্ত্বেও নভেম্বর মাসে উভয় পক্ষই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। অক্টোবর থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সমস্ত সীমান্ত চলাচল বন্ধ রয়েছে। যার ফলে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে কাবুলের তরফ থেকে লিখিত আশ্বাস দিতে হবে যে তারা পাকিস্তানের ওপর হামলার জন্য নিজেদের মাটি ব্যবহার করতে দেবে না। তিনি বলেন, পাকিস্তান সম্প্রতি রাষ্টপুঞ্জকে আফগানিস্তানে ত্রাণ সরবরাহ করার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তান তাদের দিক থেকে গেট না খোলায় ত্রাণের ট্রাকগুলি পাকিস্তানে আটকে পড়েছিল। যদিও কাবুল এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।