আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্চ মাস মানেই সাধারণত গরমের সূচনা। কিন্তু এবছর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে দেখা যাচ্ছে একেবারে উল্টো ছবি। দেশজুড়ে বৃষ্টি, বজ্রঝড়, দমকা হাওয়া এমনকি শিলাবৃষ্টিও হচ্ছে—যা আবহাওয়াবিদদের মতে একেবারেই অস্বাভাবিক। এই বিরল পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একটি অদ্ভুত ধরনের ‘পশ্চিমী ঝঞ্ঝা’, যা স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে নতুন ধরণের আবহাওয়া তৈরি করছে। এই বিশেষ আবহাওয়া ব্যবস্থা প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সরলরেখার মতো নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি করেছে, যা আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান পেরিয়ে ভারতের গভীরে প্রবেশ করেছে।
সাধারণত, এটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপ থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে বেঁকে আসে এবং শীতকালে তুষারপাত ও ঠান্ডা হাওয়া নিয়ে আসে। কিন্তু এবারের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, এটি একটি সরল ট্রাফ বা রেখার মতো বিস্তৃত—যা আবহাওয়ার অস্থিরতার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।
বর্তমানে উত্তর পাকিস্তানের উপর একটি উপরের স্তরের ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয় রয়েছে, যা উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি এবং হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্পষ্ট। উপ-হিমালয় সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল ও তামিলনাড়ুতেও ভারী বৃষ্টি দেখা গেছে। একাধিক রাজ্যে শিলাবৃষ্টির খবরও মিলেছে, যা কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
এই পশ্চিমী ঝঞ্ঝার গঠনও বেশ জটিল। এটি উপরের বায়ুমণ্ডলের ট্রাফের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিচের স্তরের একাধিক ঘূর্ণাবর্তের সঙ্গে মিশে গেছে। মধ্যপ্রদেশের উত্তরাংশ, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিম রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তর-পূর্ব অসম এবং দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে এই ঘূর্ণাবর্তগুলি সক্রিয় রয়েছে, যা আবহাওয়াকে আরও অস্থির করে তুলছে।
এই বিরল আবহাওয়ার পেছনে আর্দ্রতার উৎসও বিস্তৃত। ভূমধ্যসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণ সাগর এবং পারস্য উপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প উঠে এই সিস্টেমে যোগ হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য পেরিয়ে আসার সময় আরব সাগর থেকেও অতিরিক্ত আর্দ্রতা যুক্ত হচ্ছে, যা হিমালয়ের পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টিপাতকে আরও তীব্র করছে।
এদিকে দিল্লি ও আশেপাশের অঞ্চলেও এই আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে। সেখানে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রঝড় ও ঘণ্টায় ৩০-৫০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইতে পারে। তাপমাত্রা ২৫-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকবে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কম।
&t=4s
সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা দেখা যায়—মাসে প্রায় ৪ থেকে ৬টি। কিন্তু মার্চের শেষ দিকে এই প্রবণতা অনেকটাই কমে যায়, কারণ জেট স্ট্রিম দুর্বল হয়ে উত্তর দিকে সরে যায়। তাই এই সময়ে এমন শক্তিশালী সিস্টেম দেখা যাওয়া অত্যন্ত বিরল।
সব মিলিয়ে, এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া প্রমাণ করছে যে জলবায়ু ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে এমন অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
