আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন ভারত মহাসাগরে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়। ঘটনাটি ঘটেছে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে আন্তর্জাতিক জলসীমায়, যেখানে ইরানের ফ্রিগেট IRIS Dena মার্কিন টর্পেডো হামলায় ডুবে যায়। জাহাজটি কয়েকদিন আগেই ভারতের আমন্ত্রণে আয়োজিত নৌ-মহড়া Exercise Milan-এ অংশ নিয়ে নিজ দেশে ফিরছিল।

এই ঘটনাকে ঘিরে ভারতের ভূরাজনৈতিক ভূমিকা, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে “নিরাপত্তা প্রদানকারী শক্তি” হিসেবে নিজেদের দাবি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কয়েক মাস আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “ভারতীয় নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরের অভিভাবক।” কিন্তু বাস্তবে সেই ভারত মহাসাগরেই ভারতের আমন্ত্রিত একটি বিদেশি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ায় সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে মনে করছেন বহু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।

ঘটনাটি ঘটে ৪ মার্চ ভোর রাতে। ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্ব উপকূলের শহর বিশাখাপত্তনম থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি রওনা দিয়েছিল IRIS Dena। দুই সপ্তাহের বহুজাতিক নৌ-মহড়ায় অংশ নেওয়ার পর সেটি ইরানের উদ্দেশ্যে ফিরে যাচ্ছিল। সেই সময় শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি মার্কিন সাবমেরিন জাহাজটিকে লক্ষ্য করে টর্পেডো নিক্ষেপ করে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসথ পরে ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের বলেন, এটি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের অংশ। তাঁর ভাষায়, “একটি আমেরিকান সাবমেরিন একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে টর্পেডো দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে।”

এই হামলার ফলে জাহাজটি দ্রুত ডুবে যায়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ৩০-এর বেশি নাবিককে জীবিত উদ্ধার করে। তবে প্রায় ৮০ জন নাবিকের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও শতাধিক নাবিক নিখোঁজ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরান এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় “সামুদ্রিক সন্ত্রাস” বলে অভিহিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগছি বলেন, “আমাদের একটি যুদ্ধজাহাজ হাজার হাজার মাইল দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আক্রমণের শিকার হয়েছে। এর পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রকে ভোগ করতে হবে।”

ইরান বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে IRIS Dena ভারতের নৌবাহিনীর আমন্ত্রণে আয়োজিত মহড়ায় অংশ নিতে এসেছিল এবং সেখান থেকে ফেরার পথেই হামলার শিকার হয়েছে। ফলে ঘটনাটি শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

এই ঘটনার পরপরই ভারতের সরকারি প্রতিক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। হামলার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর ভারতীয় নৌবাহিনী একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেয়, যেখানে বলা হয় যে তারা জাহাজটির বিপদ সংকেত পেয়েছিল এবং উদ্ধার সহায়তা পাঠানোর কথা ভাবছিল। তবে তার আগেই শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

এখন পর্যন্ত নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করেনি। এই নীরবতাই বিতর্কের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের প্রাক্তন নৌবাহিনী প্রধান অরুণ প্রকাশ বলেন, “যদি ভারত এই হামলার বিষয়ে আগে থেকে না জানত, তবে তা ভারত-মার্কিন কৌশলগত সম্পর্কের জন্য উদ্বেগের বিষয়। আর যদি জানত, তাহলে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।”

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি ভারতের সেই ধারণাকেও আঘাত করেছে যে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে তারা একটি “নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার” বা নিরাপত্তা প্রদানকারী শক্তি।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ঘটনাটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ঐতিহাসিকভাবে ভারত ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও উল্লেখযোগ্যভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ত্রিমুখী সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা এখন ভারতের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যখন পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং তার প্রভাব ভারত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এই ঘটনার পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সামরিক ও কৌশলগত অভিঘাত ভারত মহাসাগর অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন হলো—এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মধ্যে কীভাবে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখা যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় ভারত মহাসাগরও আর আগের মতো নিরাপদ অঞ্চল নয়।