আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরের পাহাসু নগর পঞ্চায়েতে নির্বাচন কমিশনের তথাকথিত ‘বড় সাফাই অভিযান’- স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR)যে কতটা অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তার এক চমকে দেয়ার মতো উদাহরণ সামনে এসেছে। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, বহু বাড়ির ঠিকানায় এমন সব ভোটারের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যারা কখনওই সেখানে বসবাস করেননি। ফলে এলাকার বাসিন্দারা যেমন হতবাক, তেমনই ক্ষুব্ধ।
মালভিয়া নগর চাপেতির বাড়ি নম্বর ১২–এর বাসিন্দা সাবির মালিক খসড়া তালিকা দেখে চমকে যান। তাঁর ঠিকানার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ১৪ জন ভোটারের নাম। আরও অবাক করার বিষয় হলো, ওই তালিকায় তাঁর ভাগ্নে ইমরানের নামও রয়েছে যিনি আদতে বহু কিলোমিটার দূরে আলিগড়ের নাই বস্তিতে থাকেন। ইমরান নিজেই জানেন না, বাকি ১৩ জন কে এবং কীভাবে তাঁরা এই বাড়ির ‘বাসিন্দা’ হয়ে উঠলেন।
একই গলির বাড়ি নম্বর ১৪–তে থাকেন মাত্র একজন ব্যক্তি, অথচ ভোটার তালিকায় সেই বাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ নাম। বাড়ি নম্বর ১৫–এর বাসিন্দা ইদ্রিসের ঠিকানায় দেখা যাচ্ছে ১০ জন হিন্দু ভোটারের নাম, যদিও তাঁরা সবাই নাকি অন্য পাড়ায় পুরানা ডাকখানা ওয়ালি গলিতে বাস করেন। একইভাবে মাহমুদের বাড়িতেও কাগজে-কলমে হঠাৎ করে ‘উপহার’ হিসেবে জুড়ে গেছে ১২ জন অতিরিক্ত ভোটার।
এই অদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়ভাবে চুপচাপ। বুথ লেভেল অফিসার দেবেন্দ্র আশ্বাস দেন, “এক-দু’দিনের মধ্যেই” সব ঠিক হয়ে যাবে। বুলন্দশহরের সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট অরুণ ভার্মা বিষয়টিকে SIR প্রক্রিয়ার একটি সাধারণ ত্রুটি বলে বর্ণনা করেন এবং বলেন, ফর্ম-৮ ব্যবহার করে এই ভুল সংশোধন করা যাবে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে জানান, পুরো SIR প্রক্রিয়ায় কোনও মৌলিক ত্রুটি নেই।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এত স্পষ্ট ভুল তথ্য আপলোড হলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে এসডিএম জানান, এনুমারেশন ফর্মে বাড়ি নম্বর লেখার আলাদা কলাম নেই এবং অনেক তথ্য আগে থেকেই প্রি-প্রিন্টেড ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি আবারও ফর্ম-৮–এর কথাই বলেন, যেন সেটাই সব সমস্যার একমাত্র 'মহৌষধ'। বুথ লেভেল অফিসার গজেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
https://www.youtube.com/shorts/xqNq-VaicTw
ঘটনাটি রাজনৈতিক রঙ নেয়, যখন সমাজবাদী পার্টির নেতা এবং পাহাসু নগর পঞ্চায়েতের সভাপতি সাগির আহমেদ একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর এলাকায় বাল্মিকি সম্প্রদায়ের ভোটারদের নাম মুসলিম পরিবারগুলির ঠিকানায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাগিরের দাবি, তাঁর নিজের বাড়ি নম্বর ১২৫–এর ঠিকানায়ই পাঁচ থেকে ছয়টি বাল্মিকি নাম যুক্ত হয়েছে। আশপাশের প্রায় এক ডজন বাড়িতে মিলিয়ে তিনি ৫৬টি সন্দেহজনক নাম খুঁজে পান।
সাগিরের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই এলাকার ২০০ মিটারের মধ্যে একটি বাল্মিকি পরিবারও নেই। অথচ খসড়া ভোটার তালিকায় যেন হঠাৎ করেই সেখানে তাদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তিনি এই বিষয়টি বুথ লেভেল অফিসারের নজরে আনলে, সাগিরের দাবি, তাঁকে বলা হয় এটি “টেকনিক্যাল ভুল” এবং এত হৈচৈ না করে চুপচাপ জানালে সমস্যা মিটে যেত।
পরবর্তীতে ভূমি-রেকর্ড দপ্তরের আধিকারিকরা এলাকায় এসে যাচাই করেন এবং সন্দেহজনক এন্ট্রিগুলিকে চিহ্নিত করেন। তবে সাগির আহমেদের অভিযোগ, এত বড় গাফিলতির পরেও এখনও পর্যন্ত কোনও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বুলন্দশহরের এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। গত এক বছরে দেশের একাধিক রাজ্যে SIR প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যে প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকা ঝরঝরে করা ও ত্রুটি দূর করা, সেটাই এখন অনেক জায়গায় প্রশাসনিক গাফিলতি, প্রযুক্তিগত অজুহাত এবং রাজনৈতিক সন্দেহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পাহাসুর ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে ভোটার তালিকার মতো সংবেদনশীল নথিতে এই ধরনের ‘কল্পনাপ্রসূত’ ভুল শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনও কাঠামোগত অসংগতি লুকিয়ে আছে?
