আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রায় এক দশক আগে কর্নাটকে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ১৭ জনের অন্যতম শ্রীকান্ত পাঙ্গারকর মহারাষ্ট্রের জালনা পুরসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তাঁর এই জয় ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

জালনা পুরসভার ওয়ার্ড ১৩-ডি থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে পাঙ্গারকর পেয়েছেন ২,৬২১টি ভোট। তিনি বিজেপি প্রার্থীকেই পরাজিত করেছেন, ব্যবধান মাত্র ১৪৪ ভোট। উল্লেখযোগ্য ভাবে, এই ওয়ার্ডে শিব সেনা কোনও প্রার্থী দেয়নি। বিরোধীদের অভিযোগ, শিব সেনার নীরব সমর্থনই পাঙ্গারকরের জয়ের পথ মসৃণ করেছে। যদিও সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাঙ্গারকর এই সমর্থনের কথা অস্বীকার করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিব সেনায় ফেরার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।

এই জয়ের ফলে পাঙ্গারকর জালনা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কর্পোরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অথচ তাঁর রাজনৈতিক অতীত ও আইনি অবস্থান দুটিই প্রবল বিতর্কিত। শিব সেনার পুরনো কর্মী পাঙ্গারকর ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দলের টিকিটে কর্পোরেটর ছিলেন, সেই সময় যখন শিব সেনায় ভাঙন হয়নি। ২০২৪ সালে তিনি শিন্ডে-শিব সেনায় ফেরার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু গৌরী লঙ্কেশ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হওয়ার কারণে তীব্র জনরোষে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরুতে নিজের বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় গৌরী লঙ্কেশকে। প্রকাশ্য দিবালোকে বাইকে এসে হামলাকারীরা এই খুন চালায়, যার ফুটেজ ধরা পড়ে সিসিটিভি ক্যামেরায়। ঘটনার পর কর্নাটক সরকার একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে। ২০১৮ সালে একটি ৬৫০ পাতার চার্জশিট জমা পড়ে। কিন্তু অভিযোগ গঠিত হয় আরও তিন বছর পরে, ২০২১ সালের নভেম্বরে। মামলার বিচার শুরু হয় ২০২২ সালে, এত দেরিতেই ক্ষোভের সূচনা।

এই মামলায় পাঙ্গারকর ও অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইপিসির ৩০২ ধারা, আর্মস অ্যাক্ট এবং কর্নাটক কন্ট্রোল অব অর্গানাইজ়ড ক্রাইম অ্যাক্ট (KCOCA)–এর আওতায় মামলা চলছে। পরবর্তী কালে জমা পড়া চার্জশিট মিলিয়ে প্রসিকিউশনের নথি এখন ৯,০০০ পৃষ্ঠারও বেশি। চার্জশিটে সনাতন সংস্থার মতো সংগঠনের নামও উঠে এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে একাধিক বুদ্ধিজীবী ও যুক্তিবাদী চিন্তাবিদের ‘হিট লিস্ট’ তৈরির অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, অন্তত ২৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই ধরনের সংগঠনের নিশানায় ছিলেন।

পাঙ্গারকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি লঙ্কেশ হত্যার সঙ্গে যুক্ত বন্দুক সংগ্রহে অর্থ সাহায্য করেছিলেন। ২০১৮ সালে SIT–এর সামনে এক সাক্ষী এমনই দাবি করেছিলেন। সেই সময় পাঙ্গারকর অবশ্য ইতিমধ্যেই মুম্বইয়ে বিচারাধীন ছিলেন। এর ঠিক এক মাস আগে, ২০১৮ সালের অগস্টে, মহারাষ্ট্র পুলিশের ATS তাঁকে গ্রেপ্তার করে নালাসোপারা অস্ত্রভাণ্ডার মামলায় যেখানে বোমা, গুলি ও অস্ত্র মজুত এবং সম্ভাব্য হামলার জায়গা চিহ্নিত করার অভিযোগ ওঠে। সেই মামলায় UAPA–সহ একাধিক গুরুতর ধারা ছিল। পরে ২০২৪ সালের অগস্টে বম্বে হাইকোর্ট তাঁকে ওই মামলায় জামিন দেয়। এর পরই তাঁর হেফাজত মহারাষ্ট্র পুলিশ থেকে কর্নাটকের SIT–এর হাতে যায়।

লঙ্কেশ হত্যায় ব্যবহৃত একই অস্ত্র আগেও ব্যবহার হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি, বিশেষ করে ২০১৫ সালে যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ অধ্যাপক এম.এম. কালবুর্গি হত্যাকাণ্ডে। এই যোগসূত্র মামলাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।

তবু বাস্তব হল, ছয় বছর জেল খাটানোর পরেও পাঙ্গারকর বা অন্য কোনও অভিযুক্তের বিচার শেষ হয়নি। দীর্ঘসূত্রতার কারণ দেখিয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কর্নাটক হাইকোর্ট পাঙ্গারকরকে জামিন দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, এত বছর বন্দি থাকার পরেও বিচার শেষ হওয়ার কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। ২০২৫ সালের শুরুতে আরও কয়েকজন অভিযুক্ত জামিন পান। সুপ্রিম কোর্টও এক সহ-অভিযুক্তের জামিন বহাল রেখেছে, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির কথা উল্লেখ করে।

স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলির দাবি, এখনও ১০০ জনের বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি বাকি। মাসে দু’-তিনটি শুনানি হওয়ায় মামলার নিষ্পত্তি কবে হবে, তা অনিশ্চিত। বেঙ্গালুরুর বিশেষ আদালতের বিচারক ২০২২ সালেই নির্দেশ দিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট সময় ধরে টানা শুনানি হবে এবং সাক্ষী তালিকা বারবার বদলানো যাবে না। কিন্তু বাস্তবে সেই গতি আর আসেনি।

প্রতি বছর গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর বোন কবিতা লঙ্কেশ সহ বহু মানুষ প্রশ্ন তোলেন বিচার এত দেরিতে কেন? যখন বিচার শুরু হয়েছে, তখনও কেন বছরের পর বছর তা ঝুলে থাকে?

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে জয়ের পর পাঙ্গারকরের বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, “আমি মানুষের আদালতে ন্যায়বিচার পেয়েছি। গৌরী লঙ্কেশ হত্যা মামলা এখনও বিচারাধীন। আমি নির্দোষ। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি।”

আইনের চোখে তিনি জামিনে মুক্ত একজন অভিযুক্ত মাত্র। কিন্তু সমাজের চোখে একজন খুনের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির নির্বাচনে জয় কি গণতন্ত্রের শক্তি, না কি বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার নগ্ন প্রকাশ এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।