আজকাল ওয়েবডেস্ক: ৫ জুলাই জয়পুরের একটি বাণিজ্যিক আদালতের বিচারক দীনেশ কুমার গুপ্ত রায় দেন যে আদানি গোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত একটি সংস্থা রাজস্থান সরকারের মালিকানাধীন এক সংস্থার ক্ষতির বিনিময়ে পরিবহণ খাতে ১,৪০০ কোটিরও বেশি টাকা আয় করেছে।
এই রায় দেওয়ার দিনই জয়পুর বাণিজ্যিক আদালতের বিচারক দীনেশ কুমার গুপ্তকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় রাজ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিচারকের অপসারণের সময় এবং পরবর্তী দ্রুত বদলি বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
গত ৫ জুলাই বিচারক গুপ্ত রায় দেন যে আদানি-নেতৃত্বাধীন একটি যৌথ উদ্যোগ সংস্থা রাজস্থান রাজ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগম লিমিটেডের কাছ থেকে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে ১,৪০০ কোটিরও বেশি টাকা পরিবহণ খরচ আদায় করেছে। সেই রায় ঘোষণার দিনই রাজ্যের বিজেপি সরকার তাঁকে বাণিজ্যিক আদালতের বিচারকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়। বাণিজ্যিক আদালতের বিচারকরা রাজ্য সরকার ও হাইকোর্টের সম্মতিক্রমে নিযুক্ত হলেও, এই ক্ষেত্রে অপসারণের সিদ্ধান্তের সময়কাল ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে।
একই দিনে রাজস্থান হাইকোর্ট বিচারক গুপ্তকে জয়পুর থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের বেওয়ার জেলায় বদলি করে। পরে ১৮ জুলাই হাইকোর্ট গুপ্তের দেওয়া রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। ওই রায়ে আদানি-নেতৃত্বাধীন সংস্থা পার্সা কেন্তে কোলিয়ারিজ লিমিটেডকে ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল এবং রাজ্য সরকারকে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলকে দিয়ে রাজ্য ও সংস্থার মধ্যকার চুক্তির অডিট করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মামলাটির পরবর্তী শুনানি ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে হওয়ার কথা।
মামলার সূত্রপাত হয় ২০০৭ সালে, যখন কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক ছত্তিশগড়ের হাসদেও অরণ্য এলাকায় একটি কয়লা ব্লক বরাদ্দ করে রাজস্থান রাজ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগমকে। উদ্দেশ্য ছিল রাজস্থানের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির জন্য সরাসরি কয়লার জোগান নিশ্চিত করা। কিন্তু পরে ওই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা আদানি গ্রুপের সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগ গঠন করে, যেখানে বেসরকারি গোষ্ঠীর অংশীদারিত্ব ছিল ৭৪ শতাংশ এবং কার্যত খনন ও সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই চলে যায়।
দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘কোল মাইনিং অ্যান্ড ডেলিভারি এগ্রিমেন্ট’ অনুযায়ী ছত্তিশগড় থেকে উত্তোলিত কয়লা রেলপথে রাজস্থানে আনার কথা ছিল এবং সেই উদ্দেশ্যে খনি থেকে মূল রেললাইনের সঙ্গে সংযোগকারী রেল সাইডিং নির্মাণের কাজ ছিল আদানি-নেতৃত্বাধীন সংস্থার। ২০১৩ সালে খনন শুরু হলেও বহু বছর ধরে সেই রেল সাইডিং নির্মিত হয়নি। এর পরিবর্তে কয়লা সড়কপথে নিকটবর্তী রেল স্টেশন পর্যন্ত পরিবহণ করা হয়, যদিও মূল চুক্তিতে সড়কপথে পরিবহণের কোনও উল্লেখ ছিল না।
তারপরও আদানি-নেতৃত্বাধীন সংস্থা ওই সড়ক পরিবহণের সম্পূর্ণ খরচ রাজস্থান সরকারের সংস্থার ওপর চাপায়, যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১,৪০০ কোটিরও বেশি। রাজ্য সংস্থা সেই টাকা পরিশোধ করলেও ২০১৮ সালে বিলম্বিত পরিশোধের সুদ দাবি করা হলে তা দিতে অস্বীকার করে। এই বিরোধ থেকেই ২০২০ সালে মামলাটি জয়পুরের বাণিজ্যিক আদালতে গড়ায়।
রায়ে বিচারক গুপ্ত স্পষ্টভাবে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী রেল সাইডিং নির্মাণ করা সংস্থার নিজস্ব দায়িত্ব ছিল এবং সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে অন্তত সড়ক পরিবহণের খরচ তাদেরই বহন করা উচিত ছিল। তাঁর পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নিজেদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে সংস্থাটি উল্টে বিপুল অঙ্কের পরিবহণ খরচ দাবি করেছে এবং তার ওপর সুদ আদায়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করেছে।
বিচারককে অপসারণের বিষয়ে স্ক্রোল ডট ইন রাজস্থান সরকারের আইন ও আইনবিষয়ক দপ্তর এবং হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারকে প্রশ্ন পাঠালেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে বিচারক দীনেশ কুমার গুপ্ত তাঁর বদলি বা মামলার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। যদিও তাঁর রায় বর্তমানে স্থগিত, তবু এই মামলা ভারতের অন্যতম বিতর্কিত খনি চুক্তি এবং রাষ্ট্র ও কর্পোরেট সম্পর্কের ওপর অভিনব এক বিচারবিভাগীয় নজরদারি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
