আবু হায়াত বিশ্বাস: নতুন বছর কংগ্রেসের সামনে নিয়ে এসেছে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একের পর এক নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ক্রমেই হারিয়ে যাওয়া দলকে ঘুরে দাঁড় করানোই এখন কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আটকে দিতে সক্ষম হলেও সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেস। বরং ২০২৫ সালে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও বিহারে বিধানসভা ও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কায় দলের মনোবল আবারও প্রশ্নের মুখে।


২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসনসংখ্যা ২৪০-এ আটকে যাওয়ায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট রাজনৈতিকভাবে স্বস্তির জায়গায় পৌঁছেছিল। কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ৫২ থেকে বেড়ে ৯৯-এ পৌঁছানোকে অনেকেই দলের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সেই আশাবাদী হাওয়া দ্রুতই স্তিমিত হয়ে যায় পরবর্তী বছর একের পর এক রাজ্যে ভোটে ভরাডুবির পর। বিজেপির কাছে পর্যদস্তু হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়ে কংগ্রেস। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সাল কংগ্রেসের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরে অসম, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল ও পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই পাঁচ রাজ্যের ফলাফলই আগামী দিনে কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ও সংগঠনিক শক্তির মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।


কংগ্রেস নেতাদের মতে, দলের ঘুরে দাঁড়ানোর মূল চাবিকাঠি সংগঠন মজবুত করা। সেই লক্ষ্যেই গত এক বছর ধরে তৃণমূল স্তরে সংগঠন ঢেলে সাজানোর চেষ্টা চলছে। দলের অভ্যন্তরে বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালকে ‘সংগঠনের বছর’ হিসেবে ধরা হয়েছিল। জেলা ও ব্লক স্তরের কমিটি গঠন, নতুন নেতৃত্ব তুলে আনা এবং কর্মীদের সক্রিয় করার লক্ষ্যে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। রাজ্যভিত্তিক পরিস্থিতি অবশ্য কংগ্রেসের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। পাঁচ রাজ্যের মধ্যে শুধুমাত্র কেরলেই কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে পিনারাই বিজয়নের বাম সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী লড়াই গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। তামিলনাড়ুতে শাসক দল ডিএমকের সঙ্গে জোটে রয়েছে কংগ্রেস। জোটের শরিক হিসেবে আগের তুলনায় কিছুটা ভালো ফলের ব্যাপারে আশাবাদী দলীয় নেতৃত্ব। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি বর্তমানে সীমিত কয়েকটি জেলায় আবদ্ধ। ফলে সেখানে বড় কোনও সাফল্যের সম্ভাবনা কম বলেই মত রাজনৈতিক মহলের। অসমে কংগ্রেসের পুনরুত্থানের চেষ্টা চলছে গৌরব গগৈয়ের নেতৃত্বে। তবে বিজেপির শক্ত সংগঠন ও ক্ষমতার দাপটের সামনে অসমে কংগ্রেসের পথ মোটেই সহজ নয়। পুদুচেরিতেও কংগ্রেসের সংগঠন দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। 

&t=1s


এই পরিস্থিতিতে গত ২৭ ডিসেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ২০২৬ সালের জন্য দলীয় রূপরেখা স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, রাজ্য ইউনিট ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা নিয়ে কংগ্রেস আগের মতোই প্রশ্ন তুলতে থাকবে। এদিকে, খাড়গে কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় কংগ্রেস সরকারের রূপায়িত জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিকে প্রচারের উপর বিশেষ জোর দেন। তামিলনাড়ুতেও, যেখানে কংগ্রেস শাসক জোটের অংশ, সেখানে প্রশাসনিক দক্ষতার উদাহরণ হিসেবে এই প্রকল্পগুলিকে তুলে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে দলের সামনে চ্যালেঞ্জের অভাব নেই। কর্ণাটকে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া ও উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের মধ্যে নেতৃত্ব সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, কেরলে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবং সংগঠন পুনর্গঠনের ধীর গতি কংগ্রেসের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন কংগ্রেসের পুনরুত্থানের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। অন্তত একটি রাজ্যে জয় না এলে দলের ভিতরে নেতৃত্ব, কৌশল ও ভবিষ্যৎ দিশা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে—এ কথা অস্বীকার করছেন না কংগ্রেস নেতারা।