আজকাল ওয়েবডেস্ক: বুধবার সকালে বিমান দুর্ঘটনায় মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের মৃত্যু হয়েছে। এর পরেই আধুনিক ইতিহাসের আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি আবার সামনে উঠে এসেছে। ১৯৫২ সালের একটি বিমান দুর্ঘটনায় যোধপুরের শেষ শাসক মহারাজা হনবন্ত সিংয়ের প্রাণহানি ঘটেছিল। এই ঘটনাটি কেবল এর মর্মান্তিক প্রকৃতির জন্যই নয়, বরং এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

রাজস্থানের প্রথম বড় বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত এই ঘটনাটি যোধপুর জেলার সুমেরপুরের কাছে ঘটেছিল। হনবন্ত সিং তাঁর স্ত্রী, অভিনেত্রী জুবেইদা বেগমের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করছিলেন। বিমান দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয়। 

১৯২৩ সালের ১৬ জুন জন্ম হনবন্ত সিংয়ের। ১৯৪৭ সালে যোধপুরের সিংহাসনে বসেন তিনি। যখন দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছিল, তখন এই তরুণ মহারাজা আনুষ্ঠানিক রাজকীয়তার আড়ালে না গিয়ে এক অপ্রচলিত পথ বেছে নেন এবং গণতন্ত্রকে গ্রহণ করেন। তিনি নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং ১৯৫২ সালের লোকসভা ও রাজস্থান বিধানসভা উভয় নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

তাঁর মৃত্যুর পর ঘোষিত ফলাফল তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে তুলে ধরেছিল। তাঁর দল থেকে মনোনীত ৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩১ জনই জয়ী হন। হনবন্ত সিং নিজে লোকসভা ও বিধানসভা উভয় আসনেই জয়লাভ করেন। তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা জয় নারায়ণ ব্যাসের জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়। 

১৯৪৩ সালে তিনি প্রথম ধ্রাঙ্গাধ্রার রাজকুমারী কৃষ্ণা কুমারীকে বিয়ে করেন, যার সঙ্গে তার তিন সন্তান ছিল। যাদের মধ্যে গজ সিং পরে যোধপুরের মহারাজা হন। বিমান চালনার অনুরাগী হিসেবে পরিচিত হনবন্ত সিং প্রায়শই ইউরোপ ভ্রমণ করতেন। যেখানে তিনি ব্রিটিশ নার্স স্যান্ড্রা ম্যাকব্রাইডের প্রেমে পড়েন। তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এই বিয়ে রাজপরিবার কখনও মেনে নেয়নি এবং স্যান্ড্রা অবশেষে ব্রিটেনে ফিরে যান।

পরবর্তীতে, ১৯৫০ সালের ১৭ ডিসেম্বর হনবন্ত মুম্বইয়ের বিখ্যাত অভিনেত্রী জুবেইদা বেগমকে বিয়ে করেন। অনেকেই বলেন, জুবেইদা হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে বিদ্যা রানী নাম ধারণ করেছিলেন। যদিও রাজপরিবার তাঁকে গ্রহণ করেনি। দম্পতির হুকুম সিং রাঠোর নামে একটি পুত্রসন্তান ছিল। জুবেইদার আগের বিয়ে থেকেও খালিদ মহম্মদ নামে একটি পুত্র ছিল। যিনি পরবর্তীকালে একজন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সমালোচক, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়েছিলেন।

অবিরাম নির্বাচনী প্রচারের ক্লান্তি এবং অপর্যাপ্ত ঘুমের পর হনবন্ত ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি রাতে একটি বিচক্র্যাফট বোনানজা বিমানে করে উদয়পুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজেই বিমানটি চালাচ্ছিলেন। পরের দিন সকালে, ২৬ জানুয়ারি যখন দেশ যখন প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করছিল, তখন বিমানটি সুমেরপুরের কাছে ভেঙে পড়ে। দম্পতির মৃত্যুর পর রাজপরিবার হুকুম সিং রাঠোরকে লালন-পালন করে। যাকে পরে প্রাসাদের ভিতরেই রহস্যজনক পরিস্থিতিতে হত্যা করা হয়। কয়েক বছর পর খালিদ মহম্মদ হনবন্ত এবং জুবেইদার প্রেমের কাহিনী একটি বইয়ে লিপিবদ্ধ করেন। যা থেকে শ্যাম বেনেগালের প্রশংসিত ছবি ‘জুবেইদা’  অনুপ্রাণিত।

পর্যবেক্ষকরা হনবন্ত এবং অজিতের মধ্যে একটি প্রতীকী সাদৃশ্য লক্ষ্য করছেন। উভয়কেই স্বাধীন রাজনৈতিক পথ অনুসরণকারী নেতা হিসেবে দেখা হয়। হনবন্ত ছিলেন স্বাধীন ভারতে প্রথম শাসক যিনি নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করে দ্রুত ক্ষমতা সুসংহত করেছিলেন। অজিতকেও এমন একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখা হয় যিনি তাঁর কাকা শরদ পাওয়ারের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করছেন।