আজকাল ওয়েবডেস্ক: মোটা বেতনের চাকরি, বিদেশে কাজের সুযোগ- এসব সুন্দর ভবিষ্যতের হাতছানি দেখিয়েই ভারতীয় যুবকদের ফাঁদে ফেলত একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। সেই স্বপ্নের পিছনে ছুটতে গিয়ে বহু তরুণ পৌঁছে যেতেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর পরই বদলে যেত সবকিছু। চাকরির বদলে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হত সাইবার প্রতারণার অন্ধকার জগৎ-এ। কেড়ে নেওয়া হত পাসপোর্ট। দিনের পর দিন চলত শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারও। শেষমেশ, জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-র জালে ধরা পড়ল মূল চক্রী-সহ পাঁচ জন।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবারই এই ঘটনায় জড়িত পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিয়েছে এনআইএ। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন মূল চক্রী আনন্দ কুমার সিং ওরফে মুন্না সিং। পটনার বিশেষ এনআইএ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে এই চার্জশিট।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, আনন্দ কুমার সিংয়ের হয়ে বিভিন্ন রাজ্যে দালাল ও ট্রাভেল এজেন্টরা কাজ করতেন। এই দালালরাই বেকার যুবকদের সঙ্গে চাকরির জন্য যোগাযোগ করতেন। এই মানবপাচার চক্র দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যুবকদের টার্গেট করা হত। তাঁদের বলা হত, কম্বোডিয়ায় মোটা বেতনের চাকরি রয়েছে। ভাল থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা, মোটা মাইনে এবং বিদেশে প্রতিষ্ঠিত সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। প্রলোভন দেখান হত, বিদেশের মাটিতে পরিবারকে নিয়েও স্থায়ীভাবে বসবাসের। অনেকে সেই ফাঁদে পড়েই তাঁদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যেতেন। এরপর সমস্ত কাগজপত্র জোগাড় করে তাঁদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হত।
কিন্তু কম্বোডিয়ার মাটিতে পা দিতেই সামনে আসত ভয়াবহ বাস্ত চিত্র। এনআইএ-র দাবি, ওই যুবকদেরকে দুই তিন হাজার ডলারের বিনিয়মে বিক্রি করা হত কম্বোডিয়া সহ আরও কয়েকটা দেশে। মূলত, কিছু প্রতারণা সংস্থার হাতে বিক্রি করা হত। সেখানে তাঁদের দিয়ে জোর করে সাইবার সংক্রান্ত জালিয়াতির কাজ করানো হত।
তদন্তকারীদের বক্তব্য, এই প্রতারণা কেন্দ্রগুলি মূলত অনলাইনে মানুষ ঠকানোর কাজ করত। বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষকে মূলত ফোন, মেসেজ বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঠকানোর কাজ করত এই চক্র। আর সেই কাজ করতেই বাধ্য করা হত ভারতীয় যুবকদের। কেউ এই কাজ করতে না চাইলে শুরু হত অত্যাচার।
এনআইএ জানিয়েছে, এই প্রতারণা সংস্থাগুলির কাছে পৌঁছানোর পরেই যুবকদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হত যাতে তাঁরা পালাতে না পারেন। তাঁদেরকে কয়েকটি অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হত। অনেক সময় খাবার ও জল পর্যন্ত দেওয়া হত না। অভিযোগ, ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতনও করা হত। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি চলত প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখানো, যৌন নির্যাতন ও নানাভাবে মানসিক চাপও সৃষ্টি করা হত।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে তদন্তকারী সংস্থা। ধৃতরা হলেন উত্তরপ্রদেশের অভয় নাথ দুবে ও রোহিত যাদব এবং বিহারের অভিরঞ্জন কুমার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কম্বোডিয়া থেকে দিল্লিতে ফেরার পর তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। আর এক অভিযুক্ত প্রহ্লাদ কুমার সিং বর্তমানে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে মূল চক্রী এখনও পলাতক।
এনআইএর মতে, এটি কোনও ছোটখাটো প্রতারণা সংস্থা নয়, বরং একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক মানের মানবপাচার চক্র। তারা আরও জানিয়েছে যে, তদন্ত এখনও চলছে। এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, দেশের কোন কোন জায়গায় এদের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে রয়েছে এবং কতজন যুবক এই ফাঁদে পড়েছেন, তা জানার চেষ্টা করছে এনআইএ। তদন্তকারীদের আশঙ্কা, এই চক্রের আরও অনেকেই জড়িত থাকতে পারেন।















