আজকাল ওয়েবডেস্ক: পৃথিবী থেকে ৪০০ কিমি ওপরে, মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতেই 'বিহু' নাচছেন সার এক মহাকাশচারী। তাঁর গায়ে সাদা-লাল গামছা, অনবরত বেজে চলেছে বিহু গানের সুর। ভাইরাল সেই ভিডিও। যা নিয়ে নেটপাড়ায় আবেগের বন্যা।
ভাইরাল সেই ভিডিও দেখে মনে করা হচ্ছে যে, কয়েক সপ্তাহ আগে সেই ভিডিও তোলা হয়েছে। কিন্তু, আসলে তা নয়। ভিডিওটি ২২ বছরের পুরনো।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রঙালি বিহুর দিন ভিডিওটি শেয়ার করেন। তিনি লেখেন, বিহু এখন ‘গ্লোবাল’। সঙ্গে টানেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বোহাগ বিহু উৎসবের প্রসঙ্গ, যেটি ২০২৩ সালে গিনেস রেকর্ড করেছিল।
ভিডিওটি দেখে আপ্লুত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন যে, 'বিহু-কে বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হতে দেখাটা সত্যিই চমৎকার।' তিনি এই মুহূর্তটিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির 'বিহু বিনন্দিয়া' অনুষ্ঠানের সঙ্গে যোগ করে দেন। উল্লেখ্য, 'বিহু বিনন্দিয়া' ছিল ২০২৩ সালে গুয়াহাটিতে আয়োজিত এক বিশাল অনুষ্ঠান, যেখানে সরুসজাই স্টেডিয়ামে ১১,০০০-এরও বেশি নৃত্যশিল্পী ও ঢোলবাদক সমবেতভাবে বিহু পরিবেশন করে 'গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড' গড়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজেও উপস্থিত ছিলেন।
তবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা খুব দ্রুত মুখ্যমন্ত্রীর দাবির ত্রুটি বা অসঙ্গতি ধরিয়ে দেন। একজন 'এক্স' ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন যে, এই ভিডিওটি ২০০৪ সালের। আর ২০০৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিং এবং অসমের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তরুণ গগৈ।
এই 'ফ্যাক্ট-চেক' বা তথ্য-যাচাইটি এতটাই নিখুঁত ছিল, যেন তা ছিল বিহুর ঢোলের এক সুনিপুণ ও লক্ষ্যভেদী আঘাতের মতোই। আর তা সত্ত্বেও, ভিডিওটি তার নিজস্ব জাদুকরী আবেদন নিয়ে আজও অমলিন হয়ে আছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা যেন আবারও নতুন করে এই ভিডিওটির প্রেমে পড়ে যান।
গামছা পরে বিহু নাচে মগ্ন এই মহাকাশচারী কে?
গামছা পরা ওই ব্যক্তি হলেন নাসার একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মহাকাশচারী মাইক ফিনকে।
চারটি ভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়ে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে মোট ৫৪৯ দিন অতিবাহিত করার সুবাদে, নাসার যে-সব মহাকাশচারী মহাকাশে সর্বাধিক সময় কাটিয়েছেন, সেই তালিকায় মাইক ফিনকে চতুর্থ স্থানে রয়েছেন।
তিনি মহাকাশের উন্মুক্ত পরিবেশে (স্পেসওয়াক) হেঁটেছেন, নিজের হাতে মহাকাশ কেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মেরামত করেছেন এবং মানবজাতির নির্মিত অন্যতম অসাধারণ এক মহাকাশ-চৌকির (মহাকাশ কেন্দ্র) নেতৃত্ব বা কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর একবার, ২০০৪ সালে, তিনি গামছা পরে বিহু পরিবেশন করেছিলেন।
সেই বছর, নাসার ‘এক্সপেডিশন ৯’ অভিযানের অংশ হিসেবে ফিঙ্কে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বসবাস করছিলেন।
এই মহাকাশ স্টেশনটি একটি ফুটবল মাঠের সমান আয়তনের গবেষণাগার। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উঁচুতে পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। ঘণ্টায় ২৮,০০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা এই স্টেশনটি প্রতি ৯০ মিনিটে গ্রহটিকে একবার পূর্ণ প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করে।
এর ভেতরে থাকা মানুষরা হেঁটে চলাফেরা করেন না, বরং তারা ভেসে বেড়ান। তারা ‘মাইক্রোগ্রাভিটি’ বা অতি-ক্ষীণ অভিকর্ষের পরিবেশে বাস করেন, এমন একটি অবস্থা যেখানে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টান কোনও বস্তুকে এক জায়গায় স্থির রাখার পক্ষে অত্যন্ত দুর্বল।
মাইক্রোগ্রাভিটি মানে কিন্তু অভিকর্ষের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়। বরং এটি এমন একটি পরিস্থিতি, যা তখনই সৃষ্টি হয়- যখন আপনি পৃথিবীর চারপাশে এত দ্রুত বেগে নীচে পড়তে থাকেন যে, আপনি কখনওই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আছড়ে পড়েন না। সেখানে প্রতিটি নড়াচড়া হয়ে ওঠে ধীরস্থির ও সুচিন্তিত। প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি এমনভাবে প্রসারিত হয় যে, বাইরে থেকে দেখলে তা প্রায় কবিতার মতোই মনে হয়।
সেই পরিস্থিতেই ফিঙ্কে তাঁর গামছাটি পরেন, গান চালু করলেন এবং নাচেন।
শূন্য অভিকর্ষের পরিবেশে বসবাসকারী একজন মানুষের হিসেবে, ফিঙ্কের বিহু নাচের মুদ্রাগুলো ছিল একেবারে নিখুঁত ও ত্রুটিহীন।
একজন নাসা মহাকাশচারী কেন মহাকাশে বিহু নাচলেন?
এর উত্তর অত্যন্ত সুন্দর। কারণ, এই মহাকাশচারীর স্ত্রী- রেনিতা সাইকিয়া ফিঙ্কে ভারতের অসমের বাসিন্দা।
মহাকাশচারী হিসেবে প্রশিক্ষণের সময় ফিঙ্কের সঙ্গে রেনিতার পরিচয় হয়। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য এক জুটির নীরব ও শান্ত স্বভাবের অংশীদার হিসেবেই তিনি সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সেই কারণেই ফিঙ্কে জানেন যে, ‘গামছা’-র তাৎপর্য আসলে কী। সেই কারণেই তিনি জানতেন যে, বিহু নাচের জন্য ঠিক কোন গানটি বাজাতে হবে।
এই নাচটি নিছক কোনও পরিবেশনা ছিল না। এটি কোনও সাংস্কৃতিক পরীক্ষানিরীক্ষাও ছিল না। এটি ছিল একজন স্বামীর - যিনি তাঁর স্ত্রীর জন্মশহর থেকে শত শত কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থান করছিলেন, নিজের স্ত্রীর ‘ঘর’ বা জন্মভূমির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা।
মাইক ফিংকে কি এখনও একজন মহাকাশচারী?
হ্যাঁ, তিনি এখনও মহাকাশচারীই আছেন। তবে বর্তমানে ফিংকে মহাকাশে নেই; আর এবার তিনি কীভাবে পৃথিবীতে ফিরে এলেন - সেই গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অধ্যায়। নাসার 'ক্রু-১১' অভিযানের অংশ হিসেবে, ফিঙ্কে আগস্ট ২০২৫ থেকে মহাকাশ স্টেশনে বসবাস ও কাজ করছিলেন।
চলতি বছর ৭ জানুয়ারি রাতে তিনি এবং তাঁর কমান্ডার মহাকাশে হাঁটার (স্পেসওয়াক) কথা ছিল, ঠিক তার আগের রাতে এমন একটি ঘটনা ঘটল যা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। মহাকাশে হাঁটা মানে হল স্টেশনের বাইরে সেই উন্মুক্ত শূন্যে বিচরণ করা, যেখানে কোনও বাতাস নেই এবং মানুষ ও এই বিশাল মহাবিশ্বের মাঝে একমাত্র আড়াল হিসেবে থাকে কেবল একটি চাপ-নিয়ন্ত্রিত বিশেষ পোশাক।
কোনওরকম পূর্বসতর্কতা ছাড়াই, তিনি হঠাৎ কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললেন। প্রায় ২০ মিনিট ধরে তাঁর মুখ দিয়ে কোনও কথাই বের হচ্ছিল না। তাঁর সহকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন। পৃথিবী থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণরত নাসার ফ্লাইট সার্জনরা তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করলেন এবং এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন যে, যা গত ২৫ বছর ধরে মহাকাশ স্টেশনে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতির ইতিহাসে এর আগে কখনও নেওয়া হয়নি।
তাঁরা পুরো ক্রু-দলকে নির্ধারিত সময়ের আগেই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আন হয়। ১৫ জানুয়ারি, ফিঙ্কে এবং তাঁর 'ক্রু-১১' দলের অন্য তিনজন সহকর্মী সান দিয়েগোর উপকূলের অদূরে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেন। যা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ইতিহাসে প্রথম 'চিকিৎসা-জনিত জরুরি প্রত্যাবর্তন'। হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারে ফিরে তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি এখন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।
তাই এই বিহুর সময়ে, সেই মানুষটি, যিনি একদা অসমের সবচেয়ে প্রিয় উৎসব ও নৃত্যশৈলীকে সুদূর নক্ষত্রলোকে পৌঁছে দিয়েছিলেন, এখন সশরীরে ফিরে এসেছেন পৃথিবীর মাটিতে।















