আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরান থেকে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার দূরে ভারতভূমিতে এক বিশেষ অভিযানে নেমেছে ইজরায়েল। 'অপারেশন উইংস অফ ডন' বা ভোরের ডানা নামের এই অভিযানের লক্ষ্য হল মণিপুরের পাহাড় থেকে বনি মেনাশে সম্প্রদায়ের প্রায় ৫,০০০ সদস্যকে তেল আবিবে পুনর্বাসন করা। এক অশান্ত অঞ্চল থেকে অন্য এক সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পাড়ি জমানোর এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই কঠিন এক যাত্রার শেষ পর্যায়, যা আসলে তাদের কয়েক হাজার বছরের পুরনো শিকড়ের সন্ধানে ঘরে ফেরা।
সম্প্রতি দিল্লির মাধ্যমে ২৫০ জন সদস্যের প্রথম দলটি ইজরায়েলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। গত বছর প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার প্রায় ৪,৬০০ জন বনি মেনাশে সদস্যের অভিবাসনে অর্থ যোগানের ঘোষণা করেছিল। গত দুই দশকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৫,০০০ মানুষ ভারত থেকে ইজরায়েলে চলে গেছেন। ইজরায়েলের অভিবাসন মন্ত্রী ওফির সোফার জানিয়েছেন, প্রতি বছর ১,২০০ জন করে এই সম্প্রদায়ের সবাইকে নিজেদের দেশে নিয়ে আসাই তাদের লক্ষ্য।
বনি মেনাশে কারা, সেই প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাচীন ইজরায়েলের ১২টি বংশ ছিল। বনি মেনাশে নিজেদের জোসেফের পুত্র মেনাশের বংশধর বলে দাবি করে। খ্রিস্টপূর্ব ৭২২ সালে আসিরীয়দের আক্রমণে ইজরায়েল রাজ্য পতনের পর তারা নির্বাসিত হয়। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে পারস্য, আফগানিস্তান, তিব্বত এবং চীন হয়ে একসময় প্রায় ১০,০০০ মানুষের এই গোষ্ঠী ভারতের মণিপুর ও মিজোরামে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। ঐতিহাসিকভাবে ভারত ইহুদিদের কাছে সবসময়ই একটি নিরাপদ আশ্রয় ছিল, কারণ বিশ্বের অন্য প্রান্তের মতো এখানে তাদের কখনো ধর্মীয় নিগ্রহের শিকার হতে হয়নি।
মণিপুরে এই জনগোষ্ঠী কুকি হিসেবে পরিচিত হলেও তাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি মূলত ইহুদি ধর্ম কেন্দ্রিক। দুর্গম পাহাড়ে ধর্মীয় পরিকাঠামো ও উপাসনার জন্য প্রয়োজনীয় ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ইহুদির কোরাম বা 'মিনিয়ান' খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল। তাই ধর্মের টানেই মূলত তারা ইজরায়েলে যেতে উন্মুখ। এমনকি ডলুইঙ্গো অ্যাপের মাধ্যমে তারা এখন হিব্রু ভাষা শিখতেও শুরু করেছেন।
তবে এই পুনর্বাসনের পেছনে ইজরায়েলের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হামাস ও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ইজরায়েলে এখন শ্রমিকের চরম সংকট চলছে। নেপাল ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ থেকে পরিযায়ী শ্রমিক আসা কমে যাওয়ায় দেশটির অর্থনীতি চাপে রয়েছে। বনি মেনাশেদের এই পুনর্বাসন সেই শ্রম ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করবে। এছাড়া গ্যালিলি বা উত্তর ইজরায়েলের সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্তটি আরব-ইজরায়েলের জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখার একটি চাল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০২৩ সালে হামাস যুদ্ধের সময় ভারত থেকে যাওয়া প্রায় ২০০ জন বনি মেনাশে সদস্য ইজরায়েলের সেনাবাহিনীর হয়ে সম্মুখ সমরে লড়াই করেছেন।
অর্থনৈতিক দিকটিও এই অভিবাসনের একটি বড় প্রভাব আছে। মণিপুরে কৃষিকাজ বা মজুরি করে যারা বছরে গড়ে ১,২০০ ডলার আয় করতেন, ইজরায়েলের ট্রাক চালক বা নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে তারা প্রায় ৫৫,০০০ ডলার আয় করছেন। গত বছর মণিপুরে মেতেই ও কুকিদের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। তাই উন্নত শিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় তারা ইজরায়েলকে বেছে নিচ্ছেন।
যদিও নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। উন্নত প্রযুক্তির পরিবেশের পাশাপাশি বর্ণবাদের মতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। স্বতন্ত্র চেহারার কারণে অনেক সময় তাদের 'চীনা' বলে কটাক্ষ করা হয়। তবুও ড্যানিয়েল হাংশিংয়ের মতো এই সম্প্রদায়ের মানুষদের বিশ্বাস, ভারত তাদের জন্মস্থান হতে পারে, কিন্তু ইজরায়েলই তাদের নিয়তি এবং প্রতিশ্রুত ভূমি। তারা মনে করেন, এই দীর্ঘ সফরের শেষ গন্তব্য হল তাদের পূর্বপুরুষদের সেই আদি নিবাস।















