আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতীয় রেলের যাত্রী ভাড়ার হিসাব ঠিক কীভাবে নির্ধারিত হয় এই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই সাধারণ যাত্রীদের মনে রয়েছে। কিন্তু সেই হিসাবের পদ্ধতি জানতে চাওয়া মানেই কি রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ? সম্প্রতি এমনই এক বিতর্কে ভারতীয় রেল জানিয়েছে, যাত্রী ভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতি, সূত্র এবং অ্যালগরিদম তাদের কাছে “ট্রেড সিক্রেট” এবং “বৌদ্ধিক সম্পত্তি”, যা তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআইয়ের আওতায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
এই অবস্থানটি রেল কর্তৃপক্ষ নিয়েছে একটি আরটিআই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে, যা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন (CIC) খারিজ করে দেয়। আবেদনকারী যাত্রীভাড়ার বিস্তারিত কাঠামো জানতে চেয়েছিলেন, ভিত্তিমূল্য কীভাবে নির্ধারিত হয়, ডায়নামিক প্রাইসিং কীভাবে কাজ করে, সময় অনুযায়ী ওঠানামা বা তৎকাল টিকিট বুকিংয়ের প্রভাব কতটা পড়ে, বিশেষ করে পশ্চিমম সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের ক্ষেত্রে।
২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি করা ওই আরটিআই আবেদনে স্পষ্টভাবে রেল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কোন কোন উপাদান ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে যাত্রীভাড়া নির্ধারিত হয় এবং ভাড়ার হার সময় ও চাহিদা অনুযায়ী কীভাবে বদলায়। এর উত্তরে রেল বোর্ডের চিফ পাবলিক ইনফরমেশন অফিসার (CPIO) জানান, যাত্রীভাড়া মূলত যাত্রীদের দেওয়া সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। তবে ভাড়া নির্ধারণের নির্দিষ্ট সূত্র, শ্রেণিবিভাগের অ্যালগরিদম বা বিস্তারিত পদ্ধতি প্রকাশ করতে তারা অস্বীকার করেন।
রেলের যুক্তি ছিল, ভাড়া নির্ধারণের এই পদ্ধতি তাদের “ট্রেড সিক্রেট” এবং “ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটস”-এর অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের তথ্য প্রকাশ করা হলে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। লিখিত উত্তরে CPIO স্পষ্টভাবে বলেন, বিভিন্ন শ্রেণির ভাড়া নির্ধারণের নীতিগত কাঠামো একটি বাণিজ্যিক গোপনীয়তার বিষয়, ফলে তা প্রকাশ করা সমীচীন নয়।
https://www.youtube.com/shorts/xqNq-VaicTw
এই যুক্তিকে সমর্থন করতে রেল কর্তৃপক্ষ তথ্যের অধিকার আইনের ধারা ৮(১)(ডি)-এর উল্লেখ করে। এই ধারায় বলা আছে, জাতীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক গোপনীয়তা, ট্রেড সিক্রেট বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সঙ্গে যুক্ত তথ্য প্রকাশ থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। রেলের দাবি, আগেও কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন এই ধরনের ব্যাখ্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি তারা এটাও উল্লেখ করেছে যে ভারতীয় রেল একদিকে যেমন একটি বাণিজ্যিক পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে তাকে জাতীয় স্বার্থে নানা সামাজিক দায়বদ্ধতাও পালন করতে হয়।
এই আপিলের শুনানিতে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন পর্যবেক্ষণ করে যে, পাবলিক ইনফরমেশন অফিসার ইতিমধ্যেই যেসব তথ্য আরটিআই আইনের আওতায় পড়ে, সেগুলি আবেদনকারীকে দেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, বাজারে উপলব্ধ নথির বাইরে গিয়ে নতুন তথ্য বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা করে দেওয়ার কোনও বাধ্যবাধকতা রেলের নেই। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কমিশন লক্ষ্য করে যে, শুনানির দিন আবেদনকারী নিজে উপস্থিত ছিলেন না।
এই সব দিক বিবেচনা করে তথ্য কমিশনার স্বাগত দাস জানান, রেলের উত্তরে কোনও গুরুতর ত্রুটি বা আইনগত অসঙ্গতি নেই। ফলে কমিশনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত কোনও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই বলে তিনি মত দেন এবং আপিলটি খারিজ করে দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় আবারও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে রাষ্ট্রীয় পরিষেবার ভাড়া নির্ধারণ কতটা স্বচ্ছ হওয়া উচিত এবং বাণিজ্যিক গোপনীয়তার অজুহাতে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে কতটা তথ্য আড়াল করা যায়। যাত্রী ভাড়া যে জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। অথচ সেই ভাড়ার হিসাবকে ‘ট্রেড সিক্রেট’ বলে ঘোষণা করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সীমা কোথায় দাঁড়ায়, তা নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক।
