আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৬ সালের ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত আয়োজিত সংসদের বিশেষ অধিবেশনে কেন্দ্রীয় সরকার তিনটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিল পেশ করেছে, যা ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে দিতে পারে। এর মধ্যে প্রধান হল 'সংবিধান সংশোধনী বিল', যেখানে লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৮১৫ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হল, ২০২৬ সালে নতুন জনশুমারি শুরু হওয়া সত্ত্বেও সরকার আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে ২০১১ সালের পুরোনো তথ্য ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ১৫ বছরের পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে কেন এই ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে?

এই পরিকল্পনার গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়কে অস্বাভাবিক সুবিধা দেবে এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোকে চরম বঞ্চনার মুখে ঠেলে দেবে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা এবং ছত্তিশগড়—এই ছয়টি হিন্দিভাষী রাজ্যে বর্তমানে ১৯৫টি আসন রয়েছে। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে লোকসভার আকার ৮০০ হলে, তাদের আসন সংখ্যা একলাফে বেড়ে ৩২৮ হতে পারে। অন্যদিকে, দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি রাজ্য (অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কেরালা, কর্ণাটক ও তামিলনাড়ু), যারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যমে সফলভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের আসন ১২৯ থেকে বেড়ে হবে মাত্র ১৬৮। অর্থাৎ, উন্নয়নের জন্য পুরস্কারের বদলে দক্ষিণ ভারতকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন করার এক নীল নকশা তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয় বিলটির মাধ্যমে একটি ডিলিমিটেশন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকার। একজন অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়ে গঠিত এই কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই সন্দিহান। অভিযোগ উঠেছে যে, অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করতেই এই কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়া সাজানো হয়েছে। তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রীরা এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের দলগুলো—বিশেষ করে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে এবং সমাজবাদী পার্টি যদি একজোট হয়ে সংসদে এর বিরোধিতা না করে, তবে ভারতের ফেডারেল কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নারী সংরক্ষণের দোহাই দিয়ে লোকসভার আকার বাড়িয়ে আদতে হিন্দি বলয়ের আধিপত্য কায়েম করার এই চেষ্টা কি গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য শুভ হবে? হাঙ্গেরির একনায়কতান্ত্রিক মডেলের ছায়া দেখা যাচ্ছে দিল্লির এই পদক্ষেপে, যা ভারতীয় গণতন্ত্রকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।