আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল লোকসভায় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে যে ঘোষণা করা হয়েছে, তা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন তর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক বিশেষ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে আশ্বাস দিয়েছেন যে, প্রস্তাবিত সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশনের ফলে কোনো রাজ্যেরই স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে না। তবে সরকারের এই মৌখিক আশ্বাসের সঙ্গে খোদ বিলের লিখিত বয়ানের যে বিস্তর ফারাক রয়েছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি। কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন, লোকসভার আসন সংখ্যা সব রাজ্যের জন্যই সমানভাবে ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে। তাঁদের যুক্তি অনুযায়ী, যদি প্রতিটি রাজ্যের আসন অর্ধেক পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তবে বর্তমানের ৫৪৪টি আসন বেড়ে দাঁড়াবে ৮১৫ বা ৮১৬-তে। এর ফলে ৩৩ শতাংশ নারী সংরক্ষণ কার্যকর করার পরও পুরুষ সদস্যদের আসন সংখ্যার কোনও কমতি হবে না। কিন্তু এখানেই দানা বাঁধছে আসল রহস্য, কারণ পেশ করা বিলে এই '৫০ শতাংশ সমান বৃদ্ধি'র কোনও উল্লেখই নেই।

সংসদে বিরোধী সদস্যরা যখন বারবার প্রশ্ন তুলছেন যে বিলে যেখানে এই নির্দিষ্ট সংখ্যার কথা নেই, সেখানে মন্ত্রীরা কিসের ভিত্তিতে এই দাবি করছেন, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অনেকটা অভিভাবকের সুরে পাল্টা বলেছেন যে, এই বিলের পাইলট বা পরিচালক হিসেবে তিনি নিজেই এই গ্যারান্টি দিচ্ছেন। তিনি এমনকি রসিকতা করে এও বলেন যে, বিষয়টি তিনি ছোট বাচ্চাদের মতো সহজ করে বুঝিয়ে দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর গলাতেও ছিল একই সুর—তিনি গ্যারান্টি দিয়ে বলেছেন যে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব বা পশ্চিম, কোনও প্রান্তের রাজ্যের প্রতিই অবিচার হবে না এবং রাজ্যগুলোর বর্তমান আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় থাকবে। অথচ পরিসংখ্যানবিদ এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন অন্য কথা। তাঁদের মতে, সরকারের এই মৌখিক প্রতিশ্রুতি এবং সংবিধানের ধারাগুলো আসলে একে অপরের পরিপন্থী।

সংবিধানের ৮১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি লোকসভা কেন্দ্রের জনসংখ্যার অনুপাত মোটামুটি সমান হতে হবে। ১৯৭১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশের মতো হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোতে জনসংখ্যা যে হারে বেড়েছে, কেরালা বা তামিলনাড়ুর মতো দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে তা ঘটেনি। এখন যদি সরকার তার পেশ করা বিল অনুযায়ী 'সর্বশেষ প্রকাশিত জনশুমারি' বা ২০১১ সালের সেন্সাস ব্যবহার করে আসন পুনর্বিন্যাস করে, তবে জনসংখ্যার আনুপাতিক হার বজায় রাখতে গেলে উত্তর ভারতের আসন সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে। অন্যদিকে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ার কারণে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর আসন বাড়ার কথা খুবই সামান্য। বিশেষজ্ঞরা সাফ বলছেন যে, হয় সরকারকে '৫০ শতাংশ সমান বৃদ্ধি'র দাবি ছাড়তে হবে, নয়তো সংবিধানের 'সমান প্রতিনিধিত্বে'র নীতি ভাঙতে হবে। কারণ গাণিতিকভাবে এই দুটি বিষয় একসাথে মেলা অসম্ভব।

এই জটিল পরিস্থিতির মাঝেই তিনটি বিল—সংবিধান সংশোধনী (১৩১তম), ডিলিমিটেশন বিল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সংক্রান্ত বিল পাস করানোর তোড়জোড় চলছে। সরকার বলছে, মহিলা সংরক্ষণ বিলকে বাস্তবায়িত করতেই এই আসন বৃদ্ধির প্রয়োজন। কিন্তু বিরোধীদের আশঙ্কা, এর আড়ালে আসলে হিন্দি বলয়ের রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা চলছে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো যেখানে ১২৯ জন সাংসদ নিয়ে বর্তমানে লোকসভার ২৩ শতাংশের বেশি প্রতিনিধিত্ব করে, সেখানে অমিত শাহ দাবি করেছেন নতুন হিসেবে তাদের আসন সংখ্যা ১৯৫-এ পৌঁছাবে। কিন্তু বিলে লিখিত কোনও  স্পষ্ট গ্যারান্টি ছাড়া এই মৌখিক আশ্বাস রাজ্যগুলোর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন থেকে যাচ্ছে। মহিলা সংরক্ষণের পবিত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে শেষ পর্যন্ত কি ফেডারেল কাঠামো বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হতে চলেছে? ২০২৬-এর এই অধিবেশন সেই বিতর্কেই সরগরম হয়ে আছে।