আজকাল ওয়েবডেস্ক: গত পাঁচ বছরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলিতে জাতিভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। সংসদীয় কমিটি এবং সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (UGC)–এর তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে অভিযোগ বৃদ্ধির হার ১১৮.৪ শতাংশ।

UGC–এর পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষে যেখানে জাতিভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগের সংখ্যা ছিল ১৭৩, সেখানে ২০২৩–২৪–এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭৮–এ। এই পাঁচ বছরে দেশের ৭০৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১,৫৫৩টি কলেজ থেকে ইক্যুয়াল অপরচুনিটি সেল (EOC) ও SC/ST সেলের মাধ্যমে মোট ১,১৬০টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

এই অভিযোগগুলির মধ্যে ১,০৫২টি ‘মীমাংসিত’ বলে দেখানো হয়েছে, যার ফলে নিষ্পত্তির হার প্রায় ৯০.৬৮ শতাংশ। তবে একই সঙ্গে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মুলতুবি মামলার সংখ্যা। ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষে যেখানে অমীমাংসিত অভিযোগ ছিল মাত্র ১৮টি, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে  সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০৮।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি (শিক্ষা, নারী, শিশু, যুব ও ক্রীড়া)–কে দেওয়া বছর ভিত্তিক তথ্যেও অভিযোগ বৃদ্ধির ধারাবাহিক প্রবণতা স্পষ্ট। ২০২০-২১ সালে অভিযোগ ছিল ১৮২টি, ২০২১-২২-এ ১৮৬টি, ২০২২-২৩২৩-এ ২৪১টি, এবং ২০২৩-২৪-এ এসে হঠাৎ বড় লাফ দিয়ে তা পৌঁছয় ৩৭৮-এ। UGC–এর এক শীর্ষ আধিকারিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযোগ বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে SC/ST সেল এবং ইক্যুয়াল অপরচুনিটি সেলের কাজকর্ম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি। তাঁর দাবি, এই সেলগুলি আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়ভাবে অভিযোগের নিষ্পত্তি করছে।

তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন বহু শিক্ষাবিদ। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এন. সুকুমারের মতে, অধিকাংশ SC/ST সেল প্রশাসনের অধীনেই কাজ করে এবং সদস্যরাও প্রশাসনের দ্বারা মনোনীত হন। এর ফলে গুরুতর ও সংবেদনশীল অভিযোগে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাক্তন SC/ST সেল সদস্য ডি.কে. লোবিয়াল। তাঁর কথায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সেলগুলির স্বায়ত্তশাসন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। তিনি মনে করেন, অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি একদিকে যেমন রিপোর্টিং বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়, তেমনই অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনে বৈষম্য এখনও বাস্তব সত্যি এই দিকটিও আড়াল করা যায় না।

UGC–এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান সুখদেও থোরাত বিষয়টির কাঠামোগত সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ২০১২ সালের ‘Promotion of Equity in Higher Education Institutions’ বিধি অনুযায়ী ইক্যুয়াল অপরচুনিটি সেল তৈরি হয়েছিল মূলত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বৈষম্যের অভিযোগ দেখার জন্য। অন্যদিকে, তারও আগে গঠিত SC/ST সেলগুলির দায়িত্ব ছিল চাকরি ও পরিষেবা সংক্রান্ত বিষয়। সমস্যা তৈরি হয়, যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এই দুইয়ের পার্থক্য না করে সব ধরনের অভিযোগ একই অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মধ্যে পাঠিয়ে দেয়।

এই তথ্য সংগ্রহের পেছনে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শীর্ষ আদালত UGC–কে নির্দেশ দেয়, ২০১২ সালের বিধির আওতায় জাতিভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দিতে। এই নির্দেশ আসে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ছাত্র রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর পর দায়ের হওয়া একটি মামলার প্রেক্ষিতে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে জাতিগত বৈষম্যের দায় ও জবাবদিহির প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

এর পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে UGC আদালতে জানায়, তারা ৩,৫২২টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেই তথ্য অনুযায়ী দেশে ৩,০৬৭টি ইক্যুয়াল অপরচুনিটি সেল এবং ৩,২৭৩টি SC/ST সেল রয়েছে। মোট অভিযোগের সংখ্যা ১,৫০৩, যার মধ্যে ১,৪২৬টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

UGC–এর প্রস্তাবিত নতুন ইক্যুইটি রেগুলেশন নিয়েও বিতর্ক কম হয়নি। রোহিত ভেমুলার মা–সহ একাধিক আবেদনকারীর অভিযোগ ছিল, খসড়া বিধিতে আগের সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলি দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। সমালোচনার মুখে গত সপ্তাহে UGC নতুন করে খসড়া বিধি প্রকাশ করেছে। সেখানে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ইক্যুইটি কমিটি ও ইক্যুয়াল অপরচুনিটি সেন্টার গঠন, ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু এবং অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে শিক্ষাবিদদের মতে, প্রশ্ন শুধু পরিসংখ্যান বা নিষ্পত্তির হার নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন হল এই ব্যবস্থাগুলি কি সত্যিই প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্যতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারছে, নাকি প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই বৈষম্যের অভিযোগ ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে।