আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুম্বইয়ের রাজনীতিতে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বৃহন্মুম্বই পুরসভা বা বিএমসি এবারের ভোটে বড়সড় পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে এক্সিট পোলগুলি। সাত বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিজেপি–শিবসেনা (একনাথ শিন্ডে শিবির) জোট স্পষ্টভাবেই এগিয়ে রয়েছে বলে দুইটি এক্সিট পোল দাবি করেছে। এশিয়ার সবচেয়ে পয়সাওয়ালা পুরসভায় ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে এই জোট ১৩০–এর বেশি ওয়ার্ড জিততে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

Axis My India–র এক্সিট পোল অনুযায়ী, বিজেপি–শিবসেনা জোট পেতে পারে ১৩১ থেকে ১৫১টি আসন। অন্যদিকে JVC–র সমীক্ষা বলছে, এই জোটের ঝুলিতে যেতে পারে প্রায় ১৩৮টি ওয়ার্ড। যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে মুম্বই পুরসভায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটতে চলেছে।

এই নির্বাচন ছিল নানা দিক থেকেই ব্যতিক্রমী। দীর্ঘ সাত বছর পর ভোট, তার ওপর বদলে যাওয়া জোট রাজনীতি, কৌশলগত সমঝোতা এবং ‘মারাঠি অস্মিতা’কে ঘিরে তীব্র প্রচার, সব মিলিয়ে ভোটের লড়াই ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। বিশেষ করে নজর কাড়ে দুই দশক পর ঠাকরে পরিবারে ঐতিহাসিক পুনর্মিলন। উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরে ২০ বছর পর একসঙ্গে ময়দানে নামেন, শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) ও মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার জোট গড়ে।

কিন্তু এক্সিট পোল বলছে, এই পুনর্মিলনের রাজনৈতিক লাভ খুব একটা হয়নি। Axis My India–র মতে, উদ্ধব–রাজ জোট পেতে পারে মাত্র ৫৮ থেকে ৬৮টি আসন। JVC–র হিসেবেও তাদের সম্ভাব্য ফল প্রায় ৫৯টি ওয়ার্ডে সীমাবদ্ধ। একসময় যেখানে বিএমসি ছিল অবিভক্ত শিবসেনার অজেয় দুর্গ, সেখানেই ঠাকরেদের দখল যে আলগা হয়ে এসেছে, তা এই সংখ্যাগুলিই স্পষ্ট করছে।

কংগ্রেসের অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। শেষ মুহূর্তে প্রকাশ আম্বেদকরের নেতৃত্বাধীন বঞ্চিত বহুজন আঘাড়ির সঙ্গে জোট বাঁধলেও, এক্সিট পোল অনুযায়ী কংগ্রেসের প্রাপ্তি হতে পারে সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৬টি আসন। অর্থাৎ বিএমসি-র ক্ষমতার সমীকরণে তারা কার্যত প্রান্তিক ভূমিকাতেই থেকে যাচ্ছে।

https://www.youtube.com/shorts/xqNq-VaicTw

ঐতিহাসিকভাবে বিএমসি ১৯৮৫ সাল থেকে (১৯৯২–৯৬ সময়কাল বাদে) অবিভক্ত শিবসেনার দখলেই ছিল। এটি ছিল সেই মঞ্চ, যেখানে বাল ঠাকরের উত্তরাধিকার সবচেয়ে শক্ত ভিত পেয়েছিল। কিন্তু এবারের এক্সিট পোল দেখাচ্ছে, একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা শিবিরের পক্ষে সমর্থনের ঢেউ সেই পুরনো সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে।

এই নির্বাচনে জোট রাজনীতি ছিল বিশেষভাবে জটিল। ২২৭ সদস্যের বিএমসি-তে বিজেপি লড়েছে ১৩৭টি আসনে, শিবসেনা (শিন্ডে) ৯০টিতে। মহাযুতির আরেক শরিক অজিত পওয়ারের এনসিপি এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। অন্যদিকে, শিবসেনা (ইউবিটি) জোট বাঁধে শরদ পওয়ারের এনসিপি ও এমএনএস-এর সঙ্গে, যদিও কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত একাই লড়াইয়ে নামে। ফলে মহাযুতি ও মহাবিকাশ আঘাড়ি-দু’দিকেই আদর্শগত ফারাক অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়।

যদি এক্সিট পোলের হিসেব বাস্তব ফলাফলে প্রতিফলিত হয়, তাহলে তা হবে ঠাকরেদের জন্য এক বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। বাল ঠাকরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে উদ্ধব ও রাজ যে দাবি তুলে ধরেছিলেন, তার ভিত্তিই তখন প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাঁদের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘মারাঠি মানূষ’-ভূমিপুত্রের অধিকার ও আঞ্চলিক গর্ব। কিন্তু এক্সিট পোল ইঙ্গিত দিচ্ছে, মুম্বইয়ের ভোটাররা সেই আবেগে সাড়া দেননি।

বরং ‘ম্যাক্সিমাম সিটি’র বাসিন্দারা তাদের আস্থা রেখেছেন দেবেন্দ্র ফড়নবিস ও একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শক্তির ওপর। প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং বাস্তব রাজনীতির হিসাব, সব মিলিয়ে বিজেপি–শিবসেনা জোটই আপাতত মুম্বই পুরসভার দখল নেওয়ার সবচেয়ে কাছাকাছি বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।