আজকাল ওয়েবডেস্ক: অরবিন্দ কেজরিওয়াল সহজে ভয় পাওয়ার পাত্র নন। জেল খেটেছেন, দুর্নীতির অভিযোগে নিজের প্রিয় সঙ্গীদের হারিয়েছেন, এমনকি দিল্লির সবথেকে বড় হারের পর ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে দল গড়েছেন। কিন্তু গত বুধবার, ২২শে এপ্রিল সকাল থেকেই সংসদের অলিন্দে যা শোনা যাচ্ছিল, তাতে আম আদমি পার্টির সুপ্রিমোর কপালে ভাঁজ পড়েছিল। সেই দুশ্চিন্তা থেকেই তিনি বারবার ফোন তুলে নিচ্ছিলেন, যা তাঁর সহকারীরা আগে খুব একটা দেখেননি।
তিনি তাঁর সাংসদদের ফোন করতে শুরু করেন। একে একে সবাইকে। কেউ ধরলেন, কেউ ধরলেন না। কেউ কেউ আশার কথা শোনালেন ঠিকই, কিন্তু ফোনের ওপার থেকে যে দীর্ঘ নীরবতা ভেসে আসছিল, তাতেই লুকিয়ে ছিল আসল বিপদের ইঙ্গিত। বুধবার সন্ধ্যায় যা সন্দেহ ছিল, বৃহস্পতিবার তা জলজ্যান্ত সত্য হয়ে সামনে এল। আপের ১০ জন রাজ্যসভা সাংসদের মধ্যে সাতজনই হাওয়া। তাঁরা চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন না, তাঁরা চলে গিয়েছেন। কাগজে সই সম্ভবত আগেই হয়ে গিয়েছিল। কেজরিওয়াল যা দেখছিলেন, তা আসলে কোনও বিদ্রোহ নয়, বরং এক সমাপ্ত গল্পের শেষ পাতা যা তাঁর সামনে খুব ধীরগতিতে প্রকাশিত হচ্ছিল।
এই গোটা ঘটনার সবথেকে যন্ত্রণাদায়ক অংশটি ছিল সন্দীপ পাঠককে ঘিরে। শুক্রবার সকালে প্রেস কনফারেন্সের কয়েক ঘণ্টা আগে পর্যন্তও কেজরিওয়াল পাঠককে ফোন করে যাচ্ছিলেন। তাঁকে বলা হচ্ছিল, পাঠক দলেই আছেন, তিনি বিক্রি হননি। কিন্তু শুক্রবার দুপুরে সেই সন্দীপ পাঠকই বিজেপি সদর দপ্তরে গিয়ে দেখা দিলেন। ২৪শে এপ্রিলের এই ধস বুঝতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে এমন এক পরিকল্পনায়, যা আসলে শুক্রবার হওয়ার কথাই ছিল না। আসল নকশাটি ছিল অনেক বেশি আড়ম্বরপূর্ণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বাংলায় ভোটের প্রচারে ব্যস্ত। ঠিক ছিল ২৭শে এপ্রিল সোমবার তিনি দিল্লি ফিরলে সাতজন সাংসদ তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন, ছবি তোলা হবে। তারপর ২৮শে এপ্রিল ঘটা করে আপ ছাড়ার ঘোষণা হবে। এটি ছিল বিজেপির পক্ষ থেকে আগামী ২০২৭ সালের পাঞ্জাব নির্বাচনের জন্য এক আগাম উপহার।
কিন্তু কেজরিওয়াল আঁচ পেয়ে যাওয়ায় বিজেপি আর দেরি করতে চায়নি। বুধবার থেকেই কেজরিওয়ালের দপ্তর থেকে ক্রমাগত ফোন যেতে শুরু করে। এই আতঙ্ক বিজেপির কানে পৌঁছাতেই তারা রণকৌশল বদলে ফেলে। সোমবারে বদলে শুক্রবারই কাজ হাসিল করার নির্দেশ আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সেই আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতের অপেক্ষা না করেই তড়িঘড়ি সব শেষ করা হয়। সাতজন সাংসদকে সরিয়ে আনার এই অপারেশনের প্রধান সেনাপতি ছিলেন রাঘব চাড্ডা। কেজরিওয়ালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, তাঁর অর্থনৈতিক বুদ্ধিদাতা হিসেবে পরিচিত এই রাঘব কেন দল ছাড়লেন, তার শিকড় অনেক গভীর। আবগারি দুর্নীতির তদন্ত যখন আপের শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রাস করছিল, তখনই রাঘব বুঝতে পেরেছিলেন তিনি আগুনের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। লন্ডনে গিয়ে দীর্ঘ সময় থাকা, চোখ অপারেশনের দোহাই দেওয়া—সবটাই ছিল আসলে নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার কৌশল। লন্ডন থেকে ফিরে আসা রাঘব আর সেই আগের মতো বিজেপি বিরোধী ঝাঁঝালো বক্তব্য রাখছিলেন না। তিনি তলে তলে বাকি ছয়জন সাংসদকেও বিজেপির পথে হাঁটার জন্য রাজি করিয়েছিলেন।
হারভজন সিংয়ের বিজেপিতে যাওয়াটা অবশ্য খুব একটা আশ্চর্যের ছিল না। ক্রিকেট মাঠের এই তারকা অনেকদিন ধরেই বিজেপির কক্ষপথে ঘুরছিলেন। শোনা যায়, উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় আপের হুইপ না মেনে বিসিসিআই-এর একটি ফোন পেয়েই তিনি দিল্লি এসে ভোট দিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ হারভজন কার কথায় চলেন, তা তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, রাজিন্দর গুপ্ত, বিক্রমজিৎ সাহানি বা অশোক মিত্তালের মতো শিল্পপতি সাংসদদের জন্য রাজনীতি ছিল স্রেফ একটা তকমা। তাঁদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রের গুডউইলে থাকাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে লভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর অশোক মিত্তালের ওপর যখন ১৫ই এপ্রিল ইডি হানা দিল, তখন তাঁর সামনে রাস্তা ছিল একটাই। আপ ভেবেছিল এটা স্রেফ একটা ভয় দেখানোর কৌশল, কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে এটি আসলে বিজেপির বড় চালের একটি অংশ মাত্র।
তবে কেজরিওয়ালের কাছে সবথেকে বড় বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে রইলেন সন্দীপ পাঠক। যিনি পাঞ্জাবে আপের অভূতপূর্ব সাফল্যের কারিগর ছিলেন, প্রতিটি বুথ কর্মীকে চিনতেন, তাঁকে দিল্লির ডামাডোলের পর দলের অন্দরে একঘরে করে দেওয়া হয়েছিল। অভিমানেই হোক বা অন্য কোনও কারণে, পাঠক তলে তলে ব্রিজ তৈরি করেছিলেন। শুক্রবার সকাল পর্যন্তও কেজরিওয়ালকে অন্ধকারে রেখে তিনি দুপুরে বিজেপির পতাকা ধরলেন। এই দলবদল অবশ্য পাঞ্জাবের ভোটারদের খুব একটা প্রভাবিত করবে না, কারণ এঁদের অনেকেরই গণভিত্তি নেই। কিন্তু বিজেপির লাভ হল সংসদীয় পাটিগণিতে। রাজ্যসভায় বিজেপির শক্তি এখন ১১৩, অর্থাৎ এনডিএ এখন সংখ্যাগুরু। মোদি সরকারের তৃতীয় মেয়াদে 'এক দেশ এক নির্বাচন' বা অন্য বড় বিল পাশ করাতে গেলে এখন আর আঞ্চলিক দলগুলোর দাক্ষিণ্যের প্রয়োজন পড়বে না। রাজ্যসভার যে দেওয়ালে বিরোধী দলগুলো বাধা তৈরি করত, ২৪শে এপ্রিল সেই দেওয়ালটাই গুঁড়িয়ে দিল বিজেপি। দিন শেষে কেজরিওয়াল শুধু এটুকুই বলতে পারলেন, বিজেপি আবার পাঞ্জাবিদের ঠকাল। কিন্তু সেই হাহাকারের মাঝে দিল্লি এবং পাঞ্জাবের রাজনৈতিক সমীকরণ চিরতরে বদলে গেল।















