আজকাল ওয়েবডেস্ক:

উত্তরপ্রদেশের আগ্রায় খোদ সিনেমা বা ক্রাইম শোর কায়দায় স্বামীকে খুন করে বাড়ির বাথরুমের মেঝেতে পুঁতে রাখার এক হাড়হিম করা ঘটনা সামনে এসেছে। শুধু তাই নয়, খুনের পর পুলিশে ডায়েরি করে এবং আত্মীয়দের বিভ্রান্ত করে টানা ৪৫ দিন ধরে স্বামীর নিখোঁজ থাকার নাটকও চালিয়ে গেছেন অভিযুক্ত স্ত্রী। শেষ পর্যন্ত পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন রুবি শর্মা নামের ওই মহিলা। আগ্রার সিকান্দ্রা থানা এলাকার রেণুকা ধাম কলোনির একটি বাড়ির বাথরুমের মেঝে খুঁড়ে ৪৪ বছর বয়সী সুরেন্দ্র কুমার শর্মার কঙ্কাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃত সুরেন্দ্র পেশায় একজন ডেলিভারি বয় ছিলেন, যিনি তাঁর মদ্যপানের অভ্যাসের কারণে সম্প্রতি কাজ হারিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত রুবি শর্মা জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী সুরেন্দ্র প্রায়ই মদ্যপান করে বাড়িতে অশান্তি করতেন এবং তাঁকে মারধর করতেন। এই রোজকার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরেই তিনি সুরেন্দ্রকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ঘটনার দিন প্রথমে রুবি তাঁর শাশুড়ি ও দুই মেয়েকে সুরেন্দ্রর এক দাদার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তাঁদের বোঝানো হয় যে, সুরেন্দ্রর পুরনো একটি ট্রাক চুরির মামলার তদন্তে পুলিশ বাড়িতে হানা দিতে পারে। 

বাড়ি ফাঁকা হওয়ার পর রুবি ক্ষীর রান্না করেন এবং তাতে ১৬ থেকে ২০টি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে সুরেন্দ্রকে খাইয়ে দেন। সুরেন্দ্র অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে খুন করা হয়। এরপর রুবি সুরেন্দ্রর দেহটি টেনে বাথরুমে নিয়ে যান এবং মেঝের একটা অংশ ভেঙে গর্ত খুঁড়ে দেহটি পুঁতে ফেলেন। ওপরে মাটি ও পাথর চাপা দেওয়ার পর একজন রাজমিস্ত্রি ডেকে বাথরুমের মেঝেতে নতুন করে ঢালাই দিয়ে টাইলস বসিয়ে দেন। কারও মনে যাতে কোনও সন্দেহ না জাগে, তাই সুরেন্দ্রকে পোঁতার পরও রুবি নিয়মিত সেই বাথরুমটি ব্যবহার করতেন।

গত ১৮ই মে রুবি আত্মীয়দের জানান যে সুরেন্দ্র নিখোঁজ হয়ে গেছেন এবং ২৬শে মে সিকান্দ্রা থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। আত্মীয় বা প্রতিবেশীরা সুরেন্দ্রর কথা জিজ্ঞাসা করলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়তেন, যাতে কেউ তাঁকে সন্দেহ না করে। এমনকি এক ভাসুরকে তিনি বলেন যে, সুরেন্দ্র ঘর থেকে ৩,০০০ টাকা এবং মোবাইল ফোন ফেলে রেখে চলে গেছেন। কিন্তু এই নিখোঁজ নাটকে প্রথম সন্দেহ প্রকাশ করেন সুরেন্দ্রর বড় ভাই অনিল শর্মা, যিনি পেশায় একজন অটোচালক। 

অনিল লক্ষ্য করেন যে, তাঁর মায়ের ৩০,০০০ টাকার মাসিক পেনশন তুলে রুবি মাত্র ১০,০০০ টাকা পরিবারের হাতে দিচ্ছেন। এছাড়া সুরেন্দ্রর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে রুবির বয়ানে বারবার অসঙ্গতি মেলায় অনিলের সন্দেহ আরও বাড়ে। গত শুক্রবার সকাল ৬টা নাগাদ রুবি হঠাৎ অনিলকে ফোন করে দাবি করেন যে সুরেন্দ্র বাড়ি ফিরে এসেছেন। অনিল তড়িঘড়ি সেই বাড়িতে পৌঁছালে রুবি বলেন সুরেন্দ্র বাথরুমে আছেন। অনিল বাথরুমে গিয়ে কাউকে না দেখে রুবির কাছে জানতে চাইলে রুবি ঠান্ডা মাথায় জবাব দেন, "ও দু-ফুট নিচে আছে"। এই কথা শুনে স্তম্ভিত অনিল সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেন।

পুলিশ এসে বাথরুমের নতুন টাইলস বসানো মেঝে খুঁড়ে সুরেন্দ্রর কঙ্কাল উদ্ধার করে। জামাকাপড় প্রায় পচে গেলেও সুরেন্দ্রর গলায় থাকা রুদ্রাক্ষের মালা এবং হাতের মেটালের কড়া দেখে পরিবারের সদস্যরা দেহটি শনাক্ত করেন। দেহাবশেষ ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ (সিটি) সৈয়দ আলি আব্বাস এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ অমীশা জানিয়েছেন, রুবিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেরায় রুবি স্বীকার করেছেন যে, 'দৃশ্যম' সিনেমা এবং 'ক্রাইম পেট্রোল' শোর বিভিন্ন পর্ব দেখেই তিনি লাশ গুম করার এই বুদ্ধি পেয়েছিলেন।

তদন্তকারীরা বর্তমানে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, যার মধ্যে রয়েছে—শুধু ঘুমের ওষুধেই সুরেন্দ্রর মৃত্যু হয়েছে নাকি অন্য কোনও উপায়ে তাঁকে শ্বাসরোধ বা আঘাত করা হয়েছিল? রুবির পক্ষে একা একটি মৃতদেহ টেনে বাথরুমে নিয়ে যাওয়া এবং গর্ত খুঁড়ে পুঁতে ফেলা সম্ভব ছিল, নাকি এর পেছনে কোনও সহযোগী রয়েছে? বাথরুমের মেঝে পুনর্নির্মাণকারী রাজমিস্ত্রি কি এই ঘটনার বিষয়ে কিছু জানতেন? পুলিশ রুবির ও সুরেন্দ্রর মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করেছে এবং তাঁদের কল রেকর্ডস (CDR), হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ও গুগল সার্চ হিস্ট্রি খতিয়ে দেখছে। ঘটনার পর থেকে সুরেন্দ্রর দুই কন্যা চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে। সায়েন্টিফিক ও ফরেনসিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই মামলার চার্জশিট গঠন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।