হাঁটুর ব্যথা, কার্টিলেজ ক্ষয় ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ভুক্তভোগী লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য এক যুগান্তকারী সুখবর দিলেন গবেষকরা। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, একটি নতুন ধরনের ইনজেকশন বা ওষুধ হাঁটুর ক্ষয়ে যাওয়া কার্টিলেজ আবার নতুন করে তৈরি করতে সক্ষম।

কী এই নতুন আবিষ্কার? গবেষকরা জানিয়েছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে একটি বিশেষ উৎসেচকের মাত্রা বেড়ে যায়। এই এনজাইমটির নাম ১৫-হাইড্রক্সি প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন ডিহাইড্রোজেনেস (১৫-পিজিডিএইচ)। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি একটি 'জিরোজাইম' অর্থাৎ বয়সজনিত ক্ষয় ও প্রদাহ বাড়ায় এমন এনজাইম। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই উৎসেচককে ব্লক করতে পারলে হাঁটুর কার্টিলেজ নিজে থেকেই মেরামত হতে শুরু করে।

এক্ষেত্রে প্রথমে ইঁদুরের ওপর এই নতুন পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়। ১৫-পিজিডিএইচ ইনহিবিটর নামের একটি ছোট অণুর ওষুধ কখনও শরীরে ইনজেকশন, কখনও সরাসরি হাঁটুতে দেওয়া হয়। এর ফলে ক্ষয়ে যাওয়া হাঁটুর কার্টিলেজ আবার পুরু, মসৃণ ও কার্যকর হয়ে ওঠে। নতুন করে তৈরি হয় হায়ালিন বা আর্টিকুলার কার্টিলেজ, যা হাঁটুর স্বাভাবিক চলাফেরার জন্য সবচেয়ে জরুরি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এক্ষেত্রে কোনও স্টেম সেল ব্যবহার করা হয়নি। বরং হাঁটুর ভেতরে থাকা পুরনো কার্টিলেজ কোষগুলোকে আবার যৌবনকালের মতো কাজ করতে শেখানো হয়েছে। এর ফলে, প্রদাহ সৃষ্টি করে এমন কোষ কমে যায়, কার্টিলেজ ভাঙে এমন কোষের সংখ্যা কমে, সুস্থ কার্টিলেজ ও তার কাঠামো গঠনকারী কোষ বাড়ে। ফলে হাঁটুর নড়াচড়া ও কার্যক্ষমতা অনেকটাই উন্নত হয়।

গবেষণায় আরও জানা গিয়েছে, যেসব ইঁদুরের এসিএল (অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট) ছিঁড়ে গিয়েছিল, তাদের নিয়মিত এই ইনজেকশন দেওয়ায় চোটের পর অস্টিওআর্থ্রাইটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। অর্থাৎ দুর্ঘটনা বা খেলাধুলার চোটের পর হাঁটু দ্রুত খারাপ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা এই চিকিৎসা ঠেকাতে পারে।

মানুষের টিস্যুতেও ইতিবাচক ফল মেলে। হাঁটু প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচারের সময় সংগৃহীত মানুষের অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হাঁটুর টিস্যু ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। সেখানেও দেখা গিয়েছে, ১৫-পিজিডিএইচ বন্ধ করলে কার্টিলেজ ক্ষয়ের লক্ষণ কমে। নতুন আর্টিকুলার কার্টিলেজ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। 

সবচেয়ে আশার খবর হল, এই , ১৫-পিজিডিএইচ ইনহিবিটরের একটি মুখে খাওয়ার ওষুধ তিমধ্যেই মানুষের ওপর ফেস-১ নিরাপত্তা পরীক্ষা সফলভাবে পেরিয়েছে। আগে এটি বয়সজনিত পেশি দুর্বলতার জন্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। এই কারণে গবেষকরা আশা করছেন,  খুব শীঘ্রই হাঁটুর রোগ ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসে মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হতে পারে।

এই গবেষণা সফল হলে ভবিষ্যতে হাঁটু বা হিপ রিপ্লেসমেন্ট সার্জারির প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেতে পারে। অপারেশন ছাড়াই ইনজেকশন বা ওষুধের মাধ্যমে কার্টিলেজ নতুন করে গজানো সম্ভব হতে পারে। হাঁটুর সমস্যায় ভুক্তভোগীদের জন্য এটি হতে পারে চিকিৎসা জগতের এক নতুন দিগন্ত।