আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে ডলারের আকাশছোঁয়া চাহিদার কারণে সোমবার ভারতীয় টাকার মূল্যে এক বড়সড় ধস নামল। সোমবার বাজার খোলার সাথে সাথেই ভারতীয় মুদ্রার দর ৯৪.২৬ থেকে ৯৪.৩০-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করতে শুরু করে, যা গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
2
8
গত শুক্রবার লেনদেন শেষ হওয়ার সময় ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার মূল্য ছিল ৯৪.২৪৭৫। বর্তমান এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের আমদানিকারক সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
3
8
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ভারতীয় মুদ্রার দাম ১.৪২ শতাংশ কমেছে, যা গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে টাকার সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই নজিরবিহীন পতনের পেছনে রয়েছে বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীতে চলা অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
4
8
ভারত যেহেতু তার প্রয়োজনীয় তেলের সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করে, তাই তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আমদানিকারকরা আগাম ডলার মজুত করতে শুরু করেছেন। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাকার মূল্য ধরে রাখতে আগে যেসব বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, তা সম্প্রতি আংশিকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। এর ফলেই বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য টাকার বিপরীতে চলে গিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
5
8
বর্তমানে তেলের বাজারের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত এক সপ্তাহে তেলের বাজারে যে ১৬.৫ শতাংশ দরবৃদ্ধি হয়েছে, তা সরাসরি ভারতীয় অর্থনীতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
6
8
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা আপাতত থমকে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তেলের জোগানকে সংকুচিত করেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের তেল আমদানির বিল বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের মুদ্রা বিশারদের মতে, যতক্ষণ না তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নামছে, ততক্ষণ টাকার দাম বাড়ার বা স্থিতিশীল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
7
8
পাশাপাশি, বিদেশি বিনিয়োগের খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা টাকা তুলে নেওয়ার ধারা অব্যাহত রেখেছেন। যদিও মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে টাকা তুলে নেওয়ার গতি কিছুটা থিতিয়ে এসেছে, তবুও ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বিদেশি মুদ্রার বহির্গমন বন্ধ হয়নি।
8
8
একদিকে উচ্চমূল্যের তেলের বিল মেটানো এবং অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে ভারতীয় টাকা দিন দিন তার শক্তি হারাচ্ছে। যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আগামী দিনে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে। এখন দেখার বিষয়, টাকার এই পতন রুখতে কেন্দ্রীয় সরকার বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আগামী দিনে কী ধরণের কঠোর আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।