নয়ের দশক পর্যন্ত হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ওপর আন্ডারওয়ার্ল্ড বা পাতাল দুনিয়ার কালো ছায়া কতটা গভীর ছিল, তা আজ আর কারও অজানা নেই। বলিউডে ছবি সুপারহিট হওয়া মানেই প্রযোজক-পরিচালকদের কাছে গ্যাংস্টারদের হুমকি বা তোলাবাজির ফোন আসা ছিল জলভাত। কিন্তু ১৯৯২ সালে ‘শোলে’-র কালজয়ী খলনায়ক ‘গব্বর সিং’ ওরফে আমজাদ খানের মৃত্যুর পর তাঁর বাড়িতে আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে যে ফোনটি এসেছিল, তার প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সেই ফোন টাকা কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং বলিউড যে টাকা আমজাদ খানকে ফাঁকি দিয়েছে, তা পাই-পাই করে আদায় করে দেওয়ার জন্য এসেছিল!

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আমজাদ খানের সুযোগ্য পুত্র শাদাব খান তাঁর বাবার মৃত্যু পরবর্তী সময়ের এমনই এক হাড়হিম করা অথচ অজানা সত্যি প্রকাশ করলেন।আমজাদ খানের আকস্মিক মৃত্যুর সময় বলিউডের তাবড় তাবড় প্রযোজকদের কাছে অভিনেতার পাওনা ছিল বিপুল অঙ্কের টাকা। শাদাব খানের কথায়, “বাবার মৃত্যুর পর আমাদের হাতে বেশ কিছু ‘ল্যাব লেটার’ (তৎকালীন সময়ে প্রযোজকদের দেওয়া লিখিত প্রতিশ্রুতির চিঠি) আসে। হিসেব করে দেখা যায়, ইন্ডাস্ট্রির কাছে বাবার মোট ১.২৭ কোটি টাকা পাওনা ছিল। ১৯৯২ সালে এই টাকার অঙ্কটা কতটা বিশাল ছিল, তা ভাবা যায় না! অথচ, বাবা মারা যাওয়ার পর একজন প্রতিষ্ঠিত প্রযোজকও সেই টাকা ফেরত দিতে এগিয়ে আসেননি।”

শাদাব আরও যোগ করেন, “যাঁদের আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল, তাঁদের দেনা বাবা বেঁচে থাকতেই মকুব করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ১.২৭ কোটি টাকা আটকে রেখেছিলেন টিনসেল টাউনের সেইসব নামী প্রযোজকেরা, যাঁদের ছবি রমরমিয়ে চলছিল।” আজ ওই টাকায় হয়তো একটা বিলাসবহুল গাড়ি কেনা সম্ভব, কিন্তু ১৯৯২ সালে ওই টাকায় মুম্বইয়ের অভিজাত এলাকা পালি হিল-এ ৩ থেকে ৪টি ফ্ল্যাট কেনা যেত।

 

বাবার সৎ উপার্জনের টাকা এভাবে বলিউড হজম করে নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল মধ্যপ্রাচ্যের আন্ডারওয়ার্ল্ড। বাবার মৃত্যুর কয়েক মাস পর আমজাদ খানের বাড়িতে একটি ফোন আসে, যা রিসিভ করেছিলেন স্বয়ং শাদাব। কুখ্যাত গ্যাংস্টারের সেই প্রস্তাবের স্মৃতি চারণা করে শাদাব বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের এক কুখ্যাত গ্যাংস্টার আমাকে ফোন করে বলে— ‘আমি শুনেছি আমজাদ সাহেবের এত টাকা আটকে রেখেছে ইন্ডাস্ট্রি। আপনারা শুধু হ্যাঁ বলুন, আগামী তিন দিনের মধ্যে ওই ১.২৭ কোটি টাকা আপনাদের দরজায় পৌঁছে যাবে।’ কিন্তু আমার মা এই প্রস্তাবে সাফ ‘না’ করে দেন।”

আমজাদ খানের স্ত্রী তথা শাদাবের মা আন্ডারওয়ার্ল্ডকে মুখের ওপর জানিয়ে দেন, “আমার স্বামী বেঁচে থাকতে কোনওদিন আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাহায্য নেননি, ওঁর মৃত্যুর পরও আমি এই নোংরা ট্রেন্ড শুরু করতে দেব না।”  

সারাজীবন পর্দার আড়ালে থাকা এক সাধারণ গৃহবধূ হওয়া সত্ত্বেও আমজাদ খানের স্ত্রী দমে যাননি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের টাকা প্রত্যাখ্যান করে তিনি নিজের ব্যবসা শুরু করেন এবং সন্তানদের বড় করে তোলেন। শাদাব কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন যে, আমজাদ খানের মৃত্যুর পর তাঁদের কঠিনতম সময়ে ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন বলিউডের প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার সেলিম খান (সলমন খানের বাবা)। সেই  দুঃসময়ে তাঁদের পাশে একমাত্র ছিলেন সেলিম খান। আমজাদ খানের শেষকৃত্যের খরচ থেকে শুরু করে পরিবারের বেশ কিছু জরুরি খরচের দায়িত্ব একার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।

রাকেশ রোশন বা করণ জোহরের মতো ব্যক্তিত্বরা যেখানে আন্ডারওয়ার্ল্ডের তোলাবাজির শিকার হয়ে প্রাণ সংশয়ে ভুগেছেন (কহো না পেয়ার হ্যায়-এর সাফল্যের পর রাকেশ রোশনকে গুলিও করা হয়েছিল), সেখানে আমজাদ খানের পরিবারের এই সততা এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোটি টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প আজ এক অনন্য নজির সৃষ্টি করল।