২২ এপ্রিল, ২০২৬। ভারতীয় সিনেমার অন্যতম কিংবদন্তি এবং বাংলা সিনেমার প্রথম সুপারস্টার কানন দেবী-র ১১০তম জন্মবার্ষিকী। গ্ল্যামার, গান এবং অসাধারণ অভিনয়ের আড়ালে যে এক অসামান্য লড়াই লুকিয়ে ছিল, তা অনেকের-ই হয়তো জানা নেই।
তিনি ছিলেন একাধারে গায়িকা, অভিনেত্রী এবং পরবর্তীকালে সফল প্রযোজক। হাওড়ার এদো গলি থেকে উঠে আসা ‘কানন বালা’ যখন ভারতের কানন দেবী হয়ে উঠলেন, তখন তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রতিষ্ঠান।১৯২৬ সালে ‘জয়দেব’ ছবির হাত ধরে যে যাত্রার শুরু, তা পরবর্তীকালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। মদন থিয়েটারস থেকে শুরু করে রাধা ফিল্মস এবং নিউ থিয়েটারস—প্রতিটি ধাপেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশেষ করে নিউ থিয়েটারসের ব্যানারে তাঁর সেই দ্রুত লয়ের গান আজও শ্রোতাদের মনে শিহরণ জাগায়।
কানন দেবীর শিল্পীজীবনে কিন্তু কম অন্ধকার অধ্যায় নেই। তখনও ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবল দাপট ছিল কাস্টিং কাউচের। একদিন এক নায়ক সাজঘরে ঢুকলেন তাঁকে ‘ন্যাচরাল অ্যাক্টিং’ শেখানোর আছিলায়। নিজের ডান হাত কাননের বুকে রাখলেন, হাতের বাঁধন ক্রমশ জোরালো হল অভিনেত্রীর বুকের উপর। সেদিন কোনও মতে পালিয়ে বেঁচেছিলেন কানন। এক পরিচালকও সুযোগ নিতে ছাড়েননি তাঁর। ‘জোর বরাত’ ছবির সেই ঘটনা বা সহকর্মীদের লোলুপ দৃষ্টি—এই অন্ধকার দিকগুলো স্পষ্ট মনে করিয়ে দেয় সেই যুগের নায়িকাদের জীবন মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। ক্যামেরার সামনে হাসিখুশি মুখটির আড়ালে ছিল এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। পরিচালক এবং সহ-অভিনেতাদের অসংবেদনশীল আচরণে যখন তিনি নিজেকে ‘পুতুল’ বলে মনে করতেন, তখনই তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তা রক্তাক্ত হত।
তিনি বারবার যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি। রুপোলি পর্দার সেই অন্ধকার জগত তাঁকে আঘাত করলেও, তিনি ভেঙে পড়েননি। হয়তো সেই কারণেই পরবর্তীতে তিনি নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘শ্রীমতী পিকচার্স’ তৈরি করেছিলেন, যাতে নিজের কাজের ওপর কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়।
‘দেবদাস’-এ ‘পার্বতী’র ভূমিকায় অভিনয় করতে না পারাটা তাঁর সারাজীবনের আক্ষেপ হয়ে ছিল, কিন্তু সেই অভাবই হয়তো তাকে পরবর্তীতে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। কানন দেবী নিজেই একবার বলেছিলেন, “আমি গায়িকা হলে বেশি ভাল হত।” হয়তো ক্যামেরার ঝিলিকের চেয়ে সুরের জগতই তাঁকে বেশি আপন মনে হতো, যেখানে কোনও প্রলোভন বা হেনস্থার ভয় ছিল না।
কেন কানন দেবী ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কানন দেবী অনন্য?
প্রথম মহিলা সুপারস্টার: তিনিই ছিলেন বাংলা সিনেমার প্রথম অপ্রতিদ্বন্দ্বী তারকা।
সংগ্রামের প্রতীক: অশিক্ষিত বা রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, চরম দারিদ্র্যকে জয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বনির্ভর।
সফল প্রযোজক: একজন অভিনেত্রী হিসেবে যে হেনস্থা তিনি সহ্য করেছেন, প্রযোজক হিসেবে তিনি সেই পথে হাঁটেননি। বরং নিজের প্রযোজনায় তিনি ছিলেন অকুতোভয়।
কানন দেবী কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন হাজারো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এক অদম্য নারীর নাম।
















