নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেই একের পর এক ব্লকবাস্টার মেগা সিরিয়াল উপহার দিয়েছিল ‘সুইট মেলোডি’ প্রযোজনা সংস্থা। ‘তৃষ্ণা’, ‘তমসারেখা’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘ধ্যাত্তেরিকা’, ‘কুরুক্ষেত্র’-র মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিক তৈরি করে রাতারাতি টালিগঞ্জের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন এই সংস্থার কর্ণধার, বিশিষ্ট প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার অতনু রায়। কিন্তু সাফল্যের মধ্যগগনে থাকাকালীনই হঠাৎ ইন্ডাস্ট্রি থেকে উধাও হয়ে যায় এই প্রথম সারির প্রযোজনা সংস্থা। পথে বসতে হয় অতনু রায়কে। দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে হাতে কোনো কাজ নেই ওঁর। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছয় যে, নিরুপায় হয়ে সংসার ও অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে নিজের স্ত্রীর গয়না থেকে শুরু করে বাড়ির প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তির সোনার গয়নাও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি!
টালিগঞ্জের এই নোংরা রাজনীতির নেপথ্যে আসলে কারা ছিল? কাদের চক্রান্তে সর্বস্বান্ত হতে হলো তাঁকে? অবশেষে আজকাল ডট ইন-এর কাছে মুখ খুলে টলিপাড়ার দুই প্রভাবশালী ভাই— অরূপ বিশ্বাস এবং স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক ও শিউরে ওঠার মতো অভিযোগ আনলেন অতনু রায়।কোনো রাখঢাক না করেই অতনু রায় সরাসরি আঙুল তুলেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং ফেডারেশনের শীর্ষনেতা স্বরূপ বিশ্বাসের দিকে। তিনি বলেন, “পরিষ্কার বলছি, এই দু’জনই দায়ী আমার এই অবস্থার জন্য। ২০০৮ এবং ২০১০ সালে লাগাতার কাজ করার ফলে আমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। তাই নিজের স্বাস্থ্য ও পরিবারের কথা ভেবে বছর তিনেকের একটা বিরতি নিই। এরপর ২০১৩ সালে যখন কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম, তখনই আমার সঙ্গে এই ঘটনা ঘটে। আর ঘটান তৎকালীন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস।”
অতনু রায় জানান, ফেডারেশনের সাথে কথা বলতে সুরুচি সঙ্ঘের অফিসে পরপর দু-দিন গিয়েও স্বরূপ বিশ্বাসের দেখা পাননি তিনি। তৃতীয় দিন সেখানে অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষের সাথে তাঁর দেখা হয় এবং অবশেষে স্বরূপ বিশ্বাসের ঘরে ডাক পান। সেই ঘরের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অতনু রায় বলেন, “স্বরূপ বিশ্বাস আমাকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘কে আপনি?’ নাম বলার পর বললেন— ‘কে অতনু রায়? কী করেন?’ আমি বললাম আমি প্রযোজক, ‘সুইট মেলোডি’ আমার সংস্থা। উনি অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন— ‘না, শুনিনি!’ আমি অবাক হয়ে অরূপ বিশ্বাসের ভাইকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম— ‘আচ্ছা, আপনি তো ফেডারেশনের সেক্রেটারি, এর আগে কোথায় কী কাজ করেছেন?’ উনি জানিয়েছিলেন উনি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। আমি আবার জিজ্ঞেস করি— ‘কোন প্রযোজনা সংস্থায়? কোন ছবিতে? কার সহকারী ছিলেন?’ কারণ ইন্ডাস্ট্রির সবাইকে আমার চেনা ছিল।”
অতনু রায়ের দাবি, এই প্রশ্নগুলো করাই ওঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে গিয়েছিল। প্রশ্ন শুনেই রেগে ঘর থেকে সোজা বেরিয়ে যান স্বরূপ বিশ্বাস। যাওয়ার আগে ফতোয়া দেওয়ার সুরে বলে যান— “আগে আপনাকে কোন প্রোডাকশন কাজ দেয় তো দেখি, তারপর কথা বলব।”
এই ঘটনার পর টলিপাড়ায় অলিখিত গুঞ্জন শুরু হয় যে অতনু রায়কে আর কেউ কাজ দেবে না। অতনু রায় বাংলা ছেড়ে কাজ করতে চলে গিয়েছিলেন হায়দরাবাদে। কিন্তু মায়ের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। ফিরে এসে শুরু হয় চরম আর্থিক অনটন ও লড়াইয়ের এক অন্ধকার অধ্যায়।
অতনু রায় কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “খুব কষ্ট করে মায়ের চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার করিয়েছিলাম। তখন মাকে দু’বেলা খাওয়াতে আমার অসম্ভব কষ্ট হতো। এত আর্থিক দুরাবস্থা হয়ে গিয়েছিল আমার। কত বড় বদমাইশি করল ভাবুন, আমাকে একটা স্বাস্থ্যসাথী কার্ড পর্যন্ত করতে দেওয়া হলো না! সেটা করতে পারলে অন্তত মা-কে আরও একটু চিকিৎসা করাতে পারতাম। কোথাও আমাকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। যাঁরা করতে চেয়েছিলেন, তাঁদেরকেও বাধা দেওয়া হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে বাড়ির গয়না বিক্রি করতে হয়েছিল, আমার বাড়ির কালীমূর্তির গয়না পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল!”
মায়ের খিদের অন্ন জোগাতে এবং তাঁকে বাঁচাতে নিজের সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে দিয়েছিলেন এই সফল প্রযোজক। তিনি স্বরূপ বিশ্বাসের কাছে হাতজোড় পর্যন্ত করেছিলেন। অতনু রায়ের কথায়, “স্বরূপ বিশ্বাসের কাছে হাত জোর করে কাজ চেয়েছিলাম। বলেছিলাম, অন্তত একটা টেকনিশিয়ান, এমনকী স্পটবয়ের কাজ করতে দিন। আমার কোনো অসুবিধে নেই। আমাকে মাকে বাঁচাতে হবে, মাকে খাওয়াতে হবে। ও আমাকে ডেকে পাঠাল। গেলাম। তারপরেও কিচ্ছু করল না। এভাবেই আস্তে আস্তে আমার প্রযোজনা সংস্থা শেষ হয়ে গেল, সঙ্গে আমিও। খুব খারাপ মানুষ স্বরূপ বিশ্বাস। এত খারাপ মানুষ আমি আমার এই জীবনে দেখিনি।”
বিগত ১৫ বছর ধরে কাজের জগৎ থেকে দূরে থাকা এবং টলিপাড়ার ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর কোপে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়া এই প্রযোজকের বয়ান, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে টালিগঞ্জের অন্দরমহলের ক্ষমতা প্রদর্শন ও চরম অমানবিকতার এক ভয়ঙ্কর রূপকে প্রকাশ করে দিল।














