বলিউডের ‘খাঁটি হিরে’ তিনি। গায়ের রঙ, চেনা নায়কোচিত চটক বা ফিল্মি পরিবারের সন্তান — কোনও কিছু ছাড়াই স্রেফ অভিনয়ের জোরে যিনি বদলে দিয়েছেন ভারতীয় সিনেমার ব্যাকরণ, তিনি নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী। আজ, ১৯ মে এই দাপুটে অভিনেতার জন্মদিন। আর এই বিশেষ দিনে নওয়াজের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানিয়ে সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে এক অনবদ্য খোলা চিঠি লিখলেন ওঁর অন্যতম অনুরাগী তথা ‘রেনবো জেলি’ ও ‘পক্ষিরাজের ডিম’ খ্যাত টলিপাড়ার বিশিষ্ট পরিচালক সৌকর্য ঘোষাল।
নওয়াজের সংলাপ বলার ধরন, কমিক টাইমিং থেকে শুরু করে ওঁর চোখের জলের অভিনয় কীভাবে দর্শকের মনের ‘ডার্টবোর্ডে’ এসে বিঁধেছে, তারই এক নিখুঁত ও আবেগময় বিশ্লেষণ করেছেন সৌকর্য।
নওয়াজউদ্দিনের একটি অমোঘ সংলাপ দিয়ে নিজের চিঠির সূচনা করেছেন পরিচালক। সৌকর্য লিখেছেন, “‘ভাগওয়ান হামারে সাথ কাহানিও মে বাত করতা হ্যা য়’— নওয়াজউদ্দিনের বলা এই সংলাপ আমি কখনও ভুলতে পারব না। পারব না কারণ যে ভাবে, যতটা প্রত্যয়ের সঙ্গে অভিনয়ের মোরকে এই অমোঘ কথাটা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন নাওয়াজ, সেটা সটান এসে বিঁধেছিল আমার মনের ডার্টবোর্ডে। অব্যর্থ। পিনপয়েন্ট।”
সৌকর্যের মতে, নওয়াজের ডায়লগ ডেলিভারি বা ডায়লগবাজি নিয়ে আস্ত একটা থিসিস বা গবেষণাপত্র লেখা সম্ভব। ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর সেই আইকনিক “বাপ কা, দাদা কা, ভাই কা... সবকা বদলা লেগা রে তেরা ফয়জল”— শুধু কি এটাই ওঁর পরিচয়? সৌকর্য মনে করিয়ে দিয়েছেন ‘সরফরোশ’ ছবির সেই জেরা করার দৃশ্য কিংবা অনুরাগ কাশ্যপের ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ ছবির লাল লকআপের সেই দৃশ্যগুলোর কথা।

শুরুর দিকে অনেকেই ভেবেছিলেন নওয়াজ বোধহয় শুধু গোবেচারা চরিত্রই ভালো করতে পারেন। নওয়াজের সেই শুরুর দিনগুলোর অভিনয়ের সূক্ষ্মতা মনে করিয়ে দিয়ে সৌকর্য লিখেছেন, “আমরা ভাবলাম গোবেচারার তোত্লামো এত নিখুঁত? জিভের মধ্যে জড়িয়ে যাওয়া থুতু, চুল, চুলকে নেওয়া ঘামের সুরসুরি, মনে করার ঢোঁক গেলা এতটা জাগতিক? এভাবে কী করে গুটিয়ে যাওয়া যায় হাঁ করা লেন্সের সামনে? হয়ত এই ধরনের গোবেচারা ক্যারেক্টার নাওয়াজের স্ট্রেংথ!”
কিন্তু দর্শকদের এই চেনা ধারণার গালে সপাটে চড় মেরেছিলেন নওয়াজ। পরিচালক লিখেছেন, “আমরা ভুল ছিলাম। কারণ এই ভাবনার মুখের ওপর নাওয়াজ ছুঁড়ে মারলেন ফয়জল আর গণেশ গাইতোন্ডের ঝাঁঝ। ইন্সপেক্টর খানের (কাহানি) মতন আমাদের 'ডাউট'কে বললেন ‘আউট’। আমরা কেমন বোকা হয়ে গেলাম। হাঁ করে শুধু ভেবে গেলাম— এ লোকটা শিল্পী না রাক্ষস?”
নওয়াজের কমিক টাইমিং এবং মানুষকে কাঁদানোর ক্ষমতারও উচ্চ প্রশংসা করেছেন সৌকর্য। ওঁর মতে, নওয়াজের কমেডি থেকে যে হাসির রোল ভুসভুসিয়ে বেরিয়ে আসে, তার একাধিক ধরন আছে— ডার্ক, মেটা, ডেডপ্যান, অকওয়ার্ড রিয়ালিজম, হাই ভেলোসিটি কিংবা স্ল্যাপস্টিক। আর এই প্রত্যেকটা ঘরানাতেই নওয়াজ “সিংহের মতন শক্তিধর, বাউলের মতন সহজ।”
কিন্তু একজন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার আসল পরীক্ষা তো মানুষকে কাঁদানোর ক্ষমতায়। ‘দ্য লাঞ্চবক্স’ ছবির প্রসঙ্গ টেনে সৌকর্য লেখেন, “হাসি, সহানুভূতি, ভয়, আতঙ্ক, মুগ্ধবোধ এসব পেরিয়ে যে কাঁদাতে পারে না, সে তো মনের আসনে জায়গা পেলেও প্রাণের কুটিরের বাইরেই থাকে। অনেকগুলো চরিত্রের পর নওয়াজ তাই ‘শেখ’ হয়ে এসে দাঁড়ালেন লাঞ্চবক্সে। ইরফান কেন্দ্রিক সে ছবিতে নাওয়াজ কেড়ে নিয়ে চলে গেলেন চোখের জল।”তবে সৌকর্য ঘোষালের মতে, নওয়াজউদ্দিন ওঁর সমস্ত চরিত্রকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন ‘বম্বে টকিজ’ ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি ‘পটল বাবু ফিল্ম স্টার’ চরিত্রটিতে। সেই চরিত্রের হাত ধরেই নওয়াজ যেন তুলে ধরেছিলেন বিশ্বের কোটি কোটি স্ট্রাগলারদের চোখের জল।
চিঠির শেষে আবেগঘন হয়ে সৌকর্য লিখেছেন, “সত্যয়জিৎ রায়ের চরিত্রটা যখন কাগজ নিয়ে হেঁটে এল দিবাকরের ফিল্ম উইদিন ফিল্মে, যখন তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেল সুপারস্টার, নাওয়াজ তখন ছলছলে ট্রিবিউট জানালেন সেই সমস্ত অভিনেতার স্ট্রাগলকে যাঁরা অপমানকে সাজিয়ে রেখেছেন ইঁটের মত। গেঁথেছেন গোপনে ঝরা চোখের জল দিয়ে। হয়ত একদিন, হয়ত তাঁরাও পেরোবেন সে পাঁচিল আর পা ডোবাবেন সাফল্যের গালিচায়। উপরের দিকে তাকিয়ে নাওয়াজের মতনই বলবেন— ‘ভাগওয়ান হামারে সাথ কাহানিও মে বাত করতা হ্যায়’!”
প্রখ্যাত পরিচালকের এই খোলা চিঠি আজ নওয়াজ-ভক্তদের হৃদয়ে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে, যা প্রমাণ করে যে ভাষা বা অঞ্চলের সীমানা পেরিয়ে নওয়াজউদ্দিনের অভিনয় কীভাবে ছুঁয়ে গিয়েছে আপামর চলচ্চিত্রপ্রেমীদের।














