সঞ্জীব কুমার। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘কোশিশ’, ‘আঁধি’, ‘শোলে’, ‘দস্তক’-এর মতো সিনেমার সেই গম্ভীর অথচ সংবেদনশীল মুখটি। অভিনয়ের জাদুতে যিনি দর্শককে মাতিয়ে রেখেছিলেন, পর্দার আড়ালে তাঁর জীবন ছিল এক করুণ বিষাদগাথা। খ্যাতির চূড়ায় থেকেও শেষ জীবনে এসে তিনি বুঝেছিলেন, যাকে তিনি বন্ধু ভেবেছেন, তারা আসলে কেবলই তাঁর আতিথেয়তার সুযোগ নিতে এসেছিল।

 

বলিউডের স্বর্ণযুগের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা সঞ্জীব কুমার। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটি অফ-স্ক্রিনে ছিলেন ভীষণই নরম মনের। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো ছিল এক চরম বিষাদময় বাস্তবতার প্রতিফলন। স্বাস্থ্যজনিত কারণে মদ্যপান ছেড়ে দেওয়ার পর, যে মানুষটিকে একসময় ঘিরে থাকত বন্ধুদের ভিড়, হঠাৎ করেই তিনি হয়ে পড়েন সম্পূর্ণ একা।

দীর্ঘদিনের মদ্যপানের অভ্যাসের কারণে হার্টের সমস্যায় পড়েছিলেন অভিনেতা। চিকিৎসকের কঠোর নির্দেশে তিনি মদ্যপান পুরোপুরি ছেড়ে দেন। আর তারপরেই ঘটে বিপত্তি। তাঁর ভাইজি জিগনা শাহ এক সাক্ষাৎকারে জানান, “সঞ্জীব কুমার মদ্যপান ছাড়ার পর তাঁর বন্ধুদের আর পাত্তা পাওয়া গেল না। তারা সবাই হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল! এমনকি কেউ একবার খোঁজ নিতেও আসেনি যে তিনি কেমন আছেন।”জিগনা আরও বলেন, “আমরা জানতামই, তারা কেবল তাঁর আতিথেয়তার জন্যই আসত। তারা তাঁর বন্ধু ছিল না, ছিল স্রেফ মুফতে পানীয় খাওয়ার আর সুযোগ-সুবিধার লোভী।”

 

অনেকে সঞ্জীব কুমারকে ‘কঞ্জুস’ বা কৃপণ ভেবে ভুল করতেন, কিন্তু সত্যিটা ছিল একেবারে ঠিক বিপরীত। প্রবীণ সাংবাদিক হানিফ জাভেরি জানান, “সঞ্জীব কুমার ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের দয়ালু। তিনি বন্ধুদের গাড়ি উপহার দিতেন, অনেকের থাকার জন্য বাড়ি কিনে দিতেন।” জিগনা শাহের মতে, আশির দশকে সঞ্জীব কুমার ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন মানুষকে প্রায় ১ কোটি টাকা সাহায্য করেছিলেন, যা সেই সময়ে একটি বিশাল অঙ্ক। তিনি বেঁচে থাকতেন বন্ধুদের জন্যই, অথচ সেই বন্ধুদের কেউই তাঁকে শেষ জীবনে বোঝার চেষ্টা করেনি।

 

সেই নিষ্ঠুর সময়েও একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছিল। সঞ্জীব কুমার প্রয়াত হওয়ার পর পরিচালক বনি কাপুর তাঁর পরিবারের কাছে এসে ৩ লাখ টাকা ফেরত দেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি তাঁর কাছে আরও ঋণী, কিন্তু এই মুহূর্তে আমি কেবল এটুকুই ফেরত দিতে পারছি। দয়া করে এটা রাখুন।” এছাড়া ইন্ডাস্ট্রির আর কেউই কখনও সঞ্জীব কুমারের দেওয়া সেই আর্থিক সাহায্য ফেরত দেয়নি।

 

পালি হিলের বাড়িতে প্রিয় খাবার আর বন্ধুদের আড্ডায় মেতে থাকতে ভালবাসতেন এই অভিনেতা। গুজরাটি হয়েও আমিষ খাবারের পদ দেখলেই নিজেকে সামলাতে পারতেন না। বিশেষ করে মুরগির মাংসের কোনও পদ হলে তো কথাই নেই। সেই ভালবাসা তাঁর এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে পালি হিল অঞ্চলের আস্ত এই বাড়িটি কিনে নিয়েছিলেন ‘ঠাকুর সাব’, স্রেফ জমিয়ে মুরগির মাংসের নানা পদ চাখবেন বলে! যাই হোক, মাত্র ৪৭ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আচমকা মৃত্যু হয় তাঁর। পেছনে রেখে যান ১৫০-এরও বেশি অনবদ্য সিনেমা। তাঁর মৃত্যু যেমন শোকের ছিল, তার চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক ছিল তাঁর শেষ জীবনের সেই চূড়ান্ত একাকীত্ব।