প্রয়াত হয়েছেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতে সমাদৃত হাঙ্গেরির কিংবদন্তি পরিচালক বেলা টার। সোমবার বুদাপেস্টের এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ধীর-গতির, সাদা-কালো, দীর্ঘ শটের সিনেমা দিয়ে যিনি সময়, আখ্যান এবং মানব অস্তিত্বের ধারণাকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। ‘স্লো সিনেমা’ আন্দোলনের একেবারে প্রথম সারির মুখ ছিলেন তিনি। তাঁর ছবির মধ্যে জড়িয়ে থাকত বিষণ্ণতার রেশ। তবে দুঃখ আর দৈনন্দিন জীর্ণতার মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে পেতেন তিনি। আর ঠিক সেটাই ফুটে উঠত তাঁর ছবিতে। ‘সেট্যানট্যাঙ্গো’, ‘ড্যামনেশনে’, ‘দ্য টুরিন হর্স’ তাঁর তৈরি সব ছবির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। বেলা টারের সৎমেয়ে  রেকা গাবোরজানি এক সাক্ষাৎকারে জানান, দীর্ঘদিন ধরে নানান গুরুতর অসুখে ভুগছিলেন তিনি।  দীর্ঘ অসুস্থতার জেরেই তাঁর মৃত্যু হয়।

 

 

হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের মেয়র এবং প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান-এর কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরোধী নেতা গেরগেই কারাচোনি এক বিবৃতিতে বলেন, “আমি যতজন মানুষকে চিনেছি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে স্বাধীন মানুষটি আর নেই।” তিনি বেলা টারকে স্মরণ করলেন এমন একজন শিল্পী হিসেবে, যিনি আজীবন লড়েছেন “মানুষের মর্যাদা”র জন্য। এই মৌলিক অথচ ক্রমশ অবহেলিত মূল্যবোধের পক্ষে।

 


‘সেট্যানট্যাঙ্গো’ (১৯৯৪) এবং ‘ভের্কমাইস্টার হারমোনিজ’ (২০০০)-এই দুই ছবি বেলা তারকে বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। তাঁর সিনেমায় সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। মিনিটের পর মিনিট ধরে চলা একটিমাত্র শট, চরিত্রের মুখে ক্যামেরার দীর্ঘ স্থির দৃষ্টি...সব মিলিয়ে আবেগের উপরের স্তর ভেঙে ঢুকে পড়া এক নির্মম বাস্তবতা।

 

যেখানে সাধারণ হলিউড ছবিতে গড় শটের দৈর্ঘ্য মাত্র আড়াই সেকেন্ড, সেখানে ‘‘সেট্যানট্যাঙ্গো’-তে একটি শটের গড় দৈর্ঘ্য দু’মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড। সাত ঘণ্টা ত্রিশ মিনিট দীর্ঘ এই ছবি, নোবেলজয়ী লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই-এর উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি, যেখানে বাস্তুচ্যুত কৃষিশ্রমিকদের এক উন্মাদ লুটচক্রের গল্প বলা হয়। অন্যদিকে, ‘ভের্কমাইস্টার হারমোনিজ’-এ এক দারিদ্রপীড়িত শহরে রহস্যময় সার্কাসের দলের আসা ঘিরে তৈরি হওয়া অশান্তি হয়ে ওঠে সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীক।এই ছবিগুলির পটভূমিতে বারবার ফিরে আসে হাঙ্গেরির গ্রামাঞ্চল- বৃষ্টি, কাদা, বাতাস, জরাজীর্ণ আধা-পরিত্যক্ত জনপদ। যা বেলা তারের সিনেমায় কেবল পরিবেশ নয়, বরং এক জীবন্ত চরিত্র।

 


ইউরোপের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর কাজ বিপুল প্রশংসা পেয়েছে। জিম জারমুশ, গাস ভ্যান স্যান্ট-এর মতো নির্মাতারা তাঁর কাজের ভক্ত ছিলেন। লেখিকা সুজান সন্টাগ ‘সাতানতাঙ্গো’-কে আখ্যা দিয়েছিলেন “মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার মতো”। তবে এত প্রশংসার পরেও তাঁর সিনেমা কখনওই ইউরোপ বা আমেরিকায় গণমানুষের বিনোদনের অংশ হয়ে ওঠেনি।

 

বেলা টার নিজেই বলেছিলেন, “৩০ বছর ধরে আমি একই বিষয়ে ছবি বানিয়ে চলেছি। মানুষের জীবন নিয়ে।” সমাজের যে প্রান্তিক স্তরের, দুঃখী মানুষদের তিনি পর্দায় এনেছেন, তাঁদেরও বাঁচার অধিকার আছে, এই বিশ্বাসেই ছিল তাঁর সিনেমা তৈরি। ২০১১ সালে শেষ ছবি ‘দ্য টুরিন হর্স’ মুক্তির পর বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবেই তিনি ঘোষণা করেন, এটাই তাঁর শেষ ছবি। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫৫!  ছবিটি সেবার জিতেছিল গ্র্যান্ড জুরি প্রাইজ। ২০২৪ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমরা যা বলার ছিল, সব বলে ফেলেছি। কাজ শেষ।”

 


বিশ্ব সিনেমা আজ হারাল এমন এক নির্মাতাকে, যিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন, ছবি ধীরগতিও হতে পারে গভীর, অস্বস্তিও হতে পারে মানবিক, আর সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, প্রতিবাদও হতে পারে।