কঙ্কনা সেনশর্মার নতুন কাজ। কিন্তু প্রত্যাশা মেটাল কি ‘অ্যাকিউসড’? ছবি দেখে লিখলেন পরমা দাশগুপ্ত। 


ভিনদেশের মাটিতে খেটে নাম কুড়োনো, সকলের রোলমডেল হতে চাওয়া সার্জেন। এদিকে, জুনিয়রদের যে কোনও ভুলে তাদের প্রায় পায়ের তলায় পিষে ফেলাটাই তার অভ্যেস। 
সমকামী দম্পতি। সম্পর্কে সন্দেহ থেকে ঈর্ষা, প্রায়োরিটির তালিকায় সবচেয়ে নিচে সঙ্গীকে রাখা-সবই আছে। শুধু প্রেমটুকুই যা নেই!

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের জাল বুনতে, তাকে সামাজিক অপমানের মুখে দাঁড় করাতে হাতিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু কার্যকারণটাই বড্ড ক্লিশে! 

‘অ্যাকিউসড’। নেটফ্লিক্সের নতুন ছবির নামটা যে তার বিশেষণ হিসেবেও এমন খাপে খাপ বসে যেতে পারে, কে জানত! ছবির গল্প থেকে চরিত্রায়ন, সব নিয়েই যে অভিযোগের পাহাড় দর্শক মহলে! মি টু থ্রিলারের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ছবি করতে গেলে যে গভীরতা বা পড়াশোনার ছাপ থাকতে হয় তার সবটুকুতে, অনুভূতি কাশ্যপের পরিচালনা বা সীমা আগরওয়াল এবং যশ কেশোয়ানির কাহিনি তার অভাব বুঝিয়ে ছেড়েছে প্রতি পদেই। কেন্দ্রবিন্দুতে কঙ্কনা সেনশর্মার মতো বলিষ্ঠ অভিনেত্রী থাকা সত্ত্বেও তাই স্রেফ লন্ডনের ঝাঁ চকচকে লোকেশনে ঝকঝকে দৃশ্যায়নেই আটকে রইল এ ছবি। গুরুতর এক প্লট এসে দাঁড়াল প্রায় কমেডির খাতায়! 

ছবিতে ডক্টর গীতিকা সেন (কঙ্কনা) লন্ডনের এক হাসপাতালের ব্যস্ত গাইনোকলজিক্যাল সার্জেন। ওই সার্জিক্যাল বিভাগের প্রধান তথা হাসপাতালের ডিন গীতিকা পান থেকে চুন খসলেই জুনিয়র সহকর্মীদের তুলোধনা করে ছাড়ে। এমনকী তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করতেও দু’বার ভাবে না। ব্যক্তিগত জীবনে গীতিকা এবং মীরা (প্রতিভা রান্তা) সমকামী দম্পতি। গীতিকার পরিবার তাদের সম্পর্কের রসায়ন সঠিক ভাবে জানলেও মীরার পরিবার এ নিয়ে অন্ধকারে। বিয়ের অ্যানিভার্সারি পার্টিতে মীরা তাই নিজের এক তুতো ভাইকে প্রথমবার আমন্ত্রণ জানায়, যাতে তার নিজের পরিবারের কাছে বিষয়টা সে সহজ করে তুলতে পারে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে গীতিকা পার্টিতে যেমন ঠিক সময়ে পৌঁছয়না, তেমনই পরে আলাদা করে মীরার সেই ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করাটাও তার হয়ে ওঠেনা। এ নিয়ে মীরার ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে সন্দেহের আকার নেয়। যার কেন্দ্রে গীতিকার প্রাক্তন। 

আর এ সবের মধ্যেই গীতিকার অফিসে আসা এক ইমেলে তার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তোলে এক অজ্ঞাতপরিচয়। হাসপাতালের এইচআর ডিরেক্টর (মনিকা মহেন্দ্রু) তার তদন্তে নিয়ে আসে যাকে, সে পুলিশ-প্রশাসনের কেউ নয়, বরং এক প্রাক্তন সাংবাদিক (মসুর আমরোহী)! ‘মি টু’ আন্দোলনের পথ ধরে অভিযোগের পর আরও অভিযোগ, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বাড়তে বাড়তে বিষয়টা গোলমেলে আকার নেয়। এদিকে, মীরাও গীতিকার গতিবিধি বুঝতে চেয়ে এক গোয়েন্দার (সুকান্ত গোয়েল) সাহায্য নেয়। কী বেরিয়ে আসবে তদন্তে? গীতিকা কি সত্যিই দোষী? কোন খাতে বইবে গীতিকা-মীরার সম্পর্ক? নাকি ভাঙনের অপেক্ষায় তাদের দাম্পত্যজীবন? এই সব উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই এগিয়েছে ছবি। 

‘মি টু’ আন্দোলনের চর্চা এমনিতেই বেশ পুরনো হয়ে গিয়েছে। তার উপরে যৌন হেনস্থার মতো গুরুতর বিষয় ঘিরে গল্প বুনতে কেন যে পরিচালক-কাহিনিকারেরা তাকে এমন উপর উপর ছুঁয়েই বেরিয়ে গেলেন, বোঝা গেল না। একের পর এক অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, সোশ্যাল মিডিয়ায় দোষারোপ চক্র, সে সবের তদন্ত, থ্রিলারের প্লট— সবই হল। কিন্তু কেমন যেন গভীরতাহীন এবং হাল্কা হাতে বোনা পুরোটাই। 

অন্যদিকে, সমকামী সম্পর্কের গল্প বলতে গেলে সবার আগে সংবেদনশীল হতে হয় সম্পর্কটার রসায়নের প্রতি। প্রেমই যার ভিত্তি, সেখানে রোম্যান্সটাকেই যদি পুরোপুরি ঢাকাচাপা দিয়ে রাখা হয়, পড়ে থাকে শুধু ঈর্ষা, সন্দেহ আর দায়িত্বশীলতার অভাব, তবে সে সম্পর্কের গল্পে দর্শককে টেনে রাখা মুশকিল। 

সবমিলিয়ে সরলরেখায় এগিয়ে চলা থ্রিলবিহীন থ্রিলারের সবটুকুতে কোথাওই তেমন মন কেড়ে উঠতে পারেনি এ ছবি। এমনকী শেষপাতের ট্যুইস্টটাও এতই কমজোরি এবং ক্লিশে যে দর্শকের মনে হতেই পারে, এতটা সময় নষ্ট হল স্রেফ। 

যে ছবিতে কঙ্কনার মতো অভিনেত্রী থাকেন, তাকে নিয়ে এমনিই খানিকটা প্রত্যাশা তৈরি হয়। হয়েওছিল। কিন্তু ‘অ্যাকিউসড’ নিরাশ করেছে সে জায়গাতেও। গোটা ছবি জুড়ে কঙ্কনা শুধু মুখভরা রাগ-বিরক্তি নিয়ে এঘর থেকে ওঘর ছুটে বেরিয়েছেন, সহকর্মীদের কিংবা মীরাকে বকাঝকা করেছেন। তাঁর অভিনয়ের চেনা দীপ্তি চোখ টানেনি বরাবরের মতো। গীতিকার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে অসহায় মীরা হিসেবে প্রতিভাকে বেশ মিষ্টি লাগে বটে কিন্তু সমকামী দম্পতি হিসেবে কঙ্কনা-প্রতিভার জুটিটাকেই বড্ড বেমানান আর খাপছাড়া দেখায়। আরও বেশি করে জানান দেয় রোমান্সের অনুপস্থিতি। এ ছাড়া বাকি কারওরই যার যার পরিসরে তেমন কিছু করার ছিল না।   

ফলে হাতে রইল পেন্সিল হয়ে ঝকঝকে মেকিংটুকুই যা পড়ে থাকে! আর কিচ্ছুটি নয়। দর্শকের খাতায় ‘অ্যাকিউসড’ তাই অ্যাকিউসড হয়েই থেকে গেল। যার আগাপাশতলা স্রেফ দোষে ভরা!