অস্কারজয়ী ভারতীয় সুরকার এ আর রহমান বলিউডে নিজের যাত্রার এক নীরব, আত্মসমালোচনামূলক অধ্যায়ের কথা প্রকাশ্যে আনলেন। স্বীকার করলেন, গত আট বছরে হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর কাজ কমেছে। ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে সম্মানিত সুরকারদের একজন হয়েও, রহমান মনে করেন, ইন্ডাস্ট্রির ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ।
সম্প্রতি দেওয়া এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে রহমান বলিউডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কীভাবে বদলেছে, সে কথাই তুলে ধরেন। স্পষ্ট করে জানান, তিনি কখনও কাজের পেছনে দৌড়াননি। আজও বিশ্বাস করেন, সততা থাকলে কাজ নিজেই এসে ধরা দেয়। রহমানের কথায়,“হতে পারে গত আট বছরে একটা পাওয়ার শিফট হয়েছে। এখন এমন কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা, যাঁরা সৃজনশীল নন। এটা হয়তো সাম্প্রদায়িক বিষয়ও হতে পারে…তবে সেটা কখনও সরাসরি আমার সামনে আসেনি। কেবল ফিসফিসে কথার মতো কানে এসেছে।”
কাজ কমে যাওয়ায় তাঁর আত্মসম্মান বা সৃজনশীল শান্তিতে কোনও আঁচ পড়েনি, এ কথাও স্পষ্ট করে দিলেন রহমান। উল্টে তিনি বিশ্বাস করেন, কাজ জোর করে খোঁজার চেয়ে কাজের নিজে এসে পড়াই ভালো। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“আপনাকে বুক করা হল, কিন্তু পরে মিউজিক কোম্পানি গিয়ে পাঁচজন কম্পোজার নিয়ে নিল। আমি বলি, ভালই তো! এতে আমার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বেশি পাচ্ছি। আমি কাজ খুঁজছি না। আমি চাই না কাজের খোঁজে বেরোতে। আমি চাই কাজ নিজে আমার কাছে আসুক। আমার সততাই যেন কাজ এনে দেয়। আমি যতটা প্রাপ্য, ততটাই পাই।”
রহমানের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন বলিউডে ফর্মুলাভিত্তিক গান, মাল্টি-কম্পোজার অ্যালবাম ক্রমশ বেড়ে চলেছে। দ্রুততা আর বাণিজ্যিক ট্রেন্ডের চাপে একক সঙ্গীত-দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময়ই পিছনে পড়ে যাচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে রহমান ফিরে তাকালেন বলিউডে নিজের শুরুর দিনগুলোর দিকেও। জানালেন, একের পর এক বড় সাফল্য এলেও তিনি দীর্ঘদিন নিজেকে ইন্ডাস্ট্রির বাইরের মানুষই মনে করতেন।১৯৯১ সালে মণি রত্নমের ‘রোজা’ দিয়ে হিন্দিতে অভিষেক, তারপর ‘বম্বে’ ও ‘দিল সে…’ এই তিনটি ছবির পরেও নাকি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যতা আসেনি। রহমান বলেন, “আসলে এই তিনটি ছবির পরেও আমি বলিউডে এক বহিরাগত-ই ছিলাম। কিন্তু ‘তাল’ ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল সেই অ্যালবাম।”
১৯৯৯ সালের সুভাষ ঘাই পরিচালিত ‘তাল’-কেই তিনি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখেন। উত্তর ভারতের শ্রোতাদের সঙ্গে অ্যালবামের গভীর সংযোগই ভাষা ও সংস্কৃতিগত দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছিল বলে মনে করেন রহমান। বলিউডে অ-মহারাষ্ট্রীয় বা দক্ষিণী শিল্পীদের প্রতি বৈষম্য আছে কি না, এই প্রশ্নে রহমান জানালেন তিনি কখনও তা সরাসরি অনুভব করেননি। শিল্পীর কথায়, “হতে পারে বিষয়টা চাপা ছিল, কিন্তু আমি তা অনুভব করিনি,” বলেন তিনি। তবে সঙ্গে যোগ করেন, আজকের ইন্ডাস্ট্রি একেবারেই আলাদা - “এখন ক্ষমতায় আছে সৃজনশীল নয়, এমন মানুষজন।”
সবকিছুর পরেও রহমান ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। পরিবার, আন্তর্জাতিক কাজ আর নিজের শিল্পমূল্য-এই তিনটিকেই তিনি অগ্রাধিকার দিতে চান।এক পুরনো অভিজ্ঞতার কথাও মনে করেন রহমান, যা তাঁকে ডাবড সংস্করণের বদলে একেবারে মৌলিক হিন্দি ছবিতে বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য করেছিল। ‘রোজা’ ও ‘দিল সে…’ সারা দেশে হিট হওয়ার পর তিনি দেখেছিলেন, তামিল গানের দুর্বল হিন্দি অনুবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। এক পুরনো সাক্ষাৎকারে রহমান বলেছিলেন, “ওটা আমার কাছে ভীষণ অপমানজনক ছিল। মানুষ বলত, ‘এই হিন্দি লিরিক্স খুব খারাপ, তামিলটাই শুনব।’”
সেই সমালোচনাই তাঁকে হিন্দি গীতিকারদের সঙ্গে আরও গভীরভাবে কাজ করতে প্ররোচিত করে, যাতে ভাষার সঙ্গে কোনও আপস না হয়, আর সঙ্গীত নিজের শর্তেই কথা বলে।
