আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বেজে উঠতেই মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি বিধানসভা কেন্দ্র ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে। এবার এই আসনে ত্রিমুখী লড়াই। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে ভোটযুদ্ধে নেমেছেন বাইরন বিশ্বাস, কংগ্রেসের প্রার্থী মনোজ চক্রবর্তী, আর বাম–আইএসএফ ও এসডিপিআই–এর যৌথ সমর্থনে লড়ছেন মশিউর রহমান।

 গত বিধানসভা নির্বাচনে সাগরদিঘি কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিটে জয়ী হয়েছিলেন সুব্রত সাহা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া ওই আসনে উপনির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতীকে লড়ে জয়ী হয়েছিলেন বাইরন। এই জয়ের কিছুদিনের মধ্যে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। এবছরও রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের প্রতীকে সাগরদিঘি কেন্দ্রে লড়ছেন বাইরন। 

নির্বাচনী ময়দানে ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছেন তৃণমূল প্রার্থী বাইরন বিশ্বাস। সাগরদিঘির মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি তুলে ধরছেন রাজ্য সরকারের উন্নয়নের খতিয়ান। লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী থেকে শুরু করে গ্রামীণ রাস্তা, পানীয় জল ও অন্য প্রকল্পগুলোতে রাজ্য সরকারের কাজের সাফল্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে জানাচ্ছেন তিনি। এলাকার যুব সমাজ থেকে প্রবীণ, সবার কাছেই ‘উন্নয়নের কান্ডারি’ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে বাইরনের। তৃণমূল শিবিরের দাবি, বাইরন বিশ্বাসের জনপ্রিয়তা এবং তৃণমূল সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ ফের একবার শাসক দলকে ওই আসনে জিততে সাহায্য করবে। 

তবে সাগরদিঘির মাটিতে এখন ভোটের লড়াই ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে বাম–এসডিপিআই–আইএসএফ–এর ‘‌মহাজোটের’‌ প্রার্থী মশিউর রহমানকে ঘিরে। কারণ, তিনি তৃণমূল পরিচালিত সাগরদিঘি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পদে থাকাকালীনই বাম–আইএসএফ–এর সমর্থন নিয়ে এসডিপিআই দলের প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে দু’‌দিন আগে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। 

‘‌মহাজোটের’‌ এই প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নিজের হলফনামায় তিনি নিজের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলা সংক্রান্ত তথ্য গোপন করে গিয়েছেন। নির্বাচনী হলফনামায় নিজেকে এসডিপিআই প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে মশিউর লিখেছেন তাঁর বিরুদ্ধে সাগরদিঘি থানায় চারটি মামলা রুজু রয়েছে এবং জঙ্গিপুর আদালতে আরও চারটি মামলা চলছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও মামলায় দোষী সাব্যস্ত হননি এসডিপিআই দলের এই প্রার্থী।
 

মশিউরকে নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির চেয়ারে বসেই সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মহিলা সদস্যাকে জাত তুলে গালিগালাজ করা–সহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এই কারণে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন মশিউর। 


সাগরদিঘি ব্লক তৃণমূলের এক নেতা জানিয়েছেন , মশিউরের নামে সাগরদিঘি থানায় মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে। অথচ মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি মাত্র চারটি মামলার কথা উল্লেখ করেছেন। এবছর ৩১ জানুয়ারি সাগরদিঘি থানায় তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাটির কোনও উল্লেখই নেই হলফনামায়। হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ ইতিমধ্যেই তুলেছে শাসক শিবির এবং গোটা ঘটনাটি নির্বাচন কমিশনের নজরে আনা হচ্ছে। 


কমিশনের এক আধিকারিক জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ রয়েছে নির্বাচনী হলফনামায় কোনও প্রার্থী তাঁর অতীতের কোনও অপরাধমূলক মামলার তথ্য গোপন করে মনোনয়ন পত্র জমা দিলে কমিশন সেই প্রার্থীর নির্বাচনে লড়ার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে। মশিউর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তথ্য গোপন করায়, কমিশন কড়া মনোভাব নিয়ে চললে মশিউরের প্রার্থীপদ বাতিল হতে পারে। 

মশিউরের নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তাঁকে অভিযুক্ত করে সাগরদিঘি থানায় ২০১৫ সালে ৩টি এবং ২০২৫ সালে একটি এফআইআর রুজু করা হয়েছে। হলফনামা অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে তপশীলি জাতি–উপজাতি সংরক্ষণ আইনে এফআইআর হওয়া ছাড়াও অবৈধভাবে কাউকে আটকে রাখা, গুরুতর আঘাত করা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সহ আরও বহু ধারায় সাগরদিঘি থানায় এফআইআর রুজু রয়েছে।

জেলা তৃণমূলের এক নেতা জানান, এবছর ৩১ জানুয়ারি মশিউরের বিরুদ্ধে সাগরদিঘি থানায় মোটর ভেহিকল আইনের ১৯০(২) এবং ৩৯ ধারায় এবং বিএনএস–এর ৩(৫), ৩১৮(৪), ৩৩৬(২), ৩৩৬(৩), ৩৩৮, ৩৪০(২) এবং ৩৪১(১) ধারায় আরও একটি এফআইআর রুজু হয়েছে। যদিও মশিউর নিজের নির্বাচনী হলফনামায় এই তথ্য বেমালুম চেপে গিয়েছেন বলে অভিযোগ। সাগরদিঘি থানার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, গত ৩১ জানুয়ারি মশিউরের বিরুদ্ধে ৪৮/২৬ কেস নম্বর দিয়ে মামলাটি চালু হয়েছে। এই মামলার কোনও উল্লেখ মশিউরের নির্বাচনী হলফনামায় নেই। 

রাজনৈতিক মহলের মতে, সাগরদিঘিতে এবার লড়াই ছিল মূলত তৃণমূল বনাম বাম–আইএসএফ ও এসডিপিআই–এর মহাজোটের। তবে তথ্য গোপনের অভিযোগ নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত গড়ালে মশিউরের প্রার্থীপদ নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। 
যদিও তথ্য গোপনের এই অভিযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়ার জন্য মশিউরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‌ওটা নিয়ে সমস্যা হবে না, ওটা ‘‌ক্লিয়ার' হয়ে গিয়েছে।’‌ 

তবে সাগরদিঘির মানুষ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে ঝুঁকবেন, তৃণমূল প্রার্থী বাইরন বিশ্বাস, নাকি বিতর্কে জড়ানো বিরোধী জোট, তার উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে, ইভিএম বাক্স খোলার পরই।