জয়ন্ত ঘোষাল 

ভোট বড় বালাই, ভোটে জন-গণেশের হৃদয় পাওয়ার জন্য রাজ-নেতাদের কত কাণ্ডই না করতে হয়!
এবার ভোটে দেখলাম, এক মহিলা প্রার্থী পথের ধারে ঘুঁটে দিতে শুরু করলেন। আসলে এক বৃদ্ধা তাঁর গ্রামের বাড়ির সামনে ঘুঁটে দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।‌ প্রার্থী প্রচারে এসেছেন।

তাঁকে দেখে সেই বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থী নেমে পড়লেন ঘুঁটে দেওয়ার কাজে। তবে একথা মানতেই হবে ঘুঁটে দিতে তিনি যে জানেন সেটা বুঝিয়ে দিলেন।
ঘটনাস্থল: আরামবাগ। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মিতা বাগ। প্রার্থী মিতা ঘুঁটে দিচ্ছিলেন। স্বীকার করতেই হবে তিনি ঘুঁটে দিতে জানেন। ঘুঁটে মেখে পাঁচিলের গায়ে ঘুঁটেগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেওয়া এবং থপথপ করে ঘুঁটেগুলো লাগানো চারটি খানি কথা নয়।
ক্যামেরাম্যানরাও ছিল এবং মোবাইলেও ছবি উঠছে। বৃদ্ধা যারপরনাই আহ্লাদিত। তিনি তো প্রার্থীকে জড়িয়ে ধরলেন। মিতা বাগ এখানেই থামলেন না।
তিনি তাঁকে কোলে তুলে নিলেন। সেই বৃদ্ধাকে কোলে তুলে নিয়ে কার্যত নাচতে শুরু করলেন। এখন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীদের মধ্যে একটা নাচের হিল্লোল শুরু হয়েছে।‌
এখন বাংলার গ্রামাঞ্চলেও গ্যাসের আকাল আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গ্যাসের সঙ্কটের মধ্যে বহু গ্রামবাসী শুরু করে দিয়েছেন, ঘুঁটে, গুল, কয়লা ব্যবহার।‌ উনুনে রান্না হচ্ছে।‌ ঘুঁটে বানানোও খুব সহজ কাজ নয়।

ঘুঁটের মধ্যে তো শুধু গোবর থাকলে হয়না। তারমধ্যে খড় এবং অনেক উপাদান মেলাতে হয়। যাদের বাড়িতে গরু আছে, সেই গরুদের খড় খাওয়ানো হয়। তাদের খড়ের যোগান থাকে।

যা নাহলে অনেক গ্রামবাসীকে খড় কিনতে হচ্ছে। আরামবাগের মিতা বাগ রীতিমতো ঘুঁটে নিয়ে একটা আলোচনা সভা করে ফেললেন গ্রামবাসীদের সঙ্গে।
 
আমরা আরামবাগ থেকে ক্যামেরা প্যান করে এবার চলে এলাম খানাকুলে।‌ ‘নদীর ঘাটের কাছে, নৌকা বাঁধা আছে’– সে তো কবির কথা।‌ কিন্তু পথঘাট জলে ডুবে গেছে। বেশিরভাগ বাড়িতেই তাই নৌকা রয়েছে।

বহু বাসিন্দাদের বর্ষাকালে মাসের পর মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাটছে। আর সেই কারণেই নৌকাতে চেপে বসে বিজেপি প্রার্থী প্রচারে নেমে পড়েছেন।‌ আরামবাগ মহকুমাকে চারটে নদী ঘিরে রেখেছে। 

দামোদর, মুণ্ডেশ্বরী, দ্বারকেশ্বর আর রূপনারায়ণ। দ্বারকেশ্বর আর রূপনারায়ণের চাপ থাকে। সেই চাপ কাটাতে নদীর নাব্যতা বাড়াতে নদীর ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন। সোজা কথায় বাঁধ দিতে হবে।

কিন্তু ঘোড়াদহ গ্রামের খানাকুল দু-নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির বিজেপির সভাপতি রূপা মন্ডল জলকাদা মাড়িয়ে ঘুরপথে আসেন রাজহাটির সেনহাট এলাকায় পঞ্চায়েত সমিতির অফিসে।

আর তাই এবার প্রচারের সময় নৌকার খুব ডিমান্ড। নৌকা পাওয়া যায় না। রূপনারায়ণের অন্যপ্রান্তে ঘাটালের সীমানা।‌ ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান হয়েছে। কিন্তু খানাকুল বা আরামবাগ মাস্টার প্ল্যান হয়নি।

আর সেই কারণেই এখন এই উপচে পড়া জল-জোয়ার-ভাটা  আর আনাজের ক্ষেত জলে পচে যাওয়া এইসব নিয়ে নৌকায় বসে বিজেপির কেষ্টবিষ্টুরা প্রচার চালাচ্ছেন।
 
এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি হিট হচ্ছে:- ‘চায়ে-পে চর্চা’। তৃণমূল কংগ্রেসও পিছিয়ে নেই। চায়ে-পে চর্চা শুধু মোদির ব্যাপার নয়। মমতা ব্যানার্জি নিজেই তো শুধু ভোটের আগে নয়, বছরের পর বছর ধরে চায়ের দোকানে ঢুকে চা বানিয়েছেন।

চায়ের সঙ্গে টা- কখনও মোমো কখনও তেলেভাজা, আড্ডা মেরেছেন।‌ এবার প্রচার সেরে ফেরার পথে চায়ের দোকানে ঢুকে চা বানিয়ে খাওয়ালেন, তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়।‌ তিনি সুগায়ক, কিন্তু গান‌ গেয়ে নয়, চা বানিয়ে তাক লাগালেন এবার ভোট-রঙ্গে।  
 
পুরশুড়ার তৃণমূল প্রার্থী পার্থ হাজারির সমর্থনে রোড শো করেন বাবুল সুপ্রিয়। তিনি রাজা রামমোহনের ভিটে, রাধানগর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে তিলকচক পর্যন্ত রোড শো করলেন।

একটা পথসভাও করলেন বাবুল। আর সেই কর্মসূচির শেষে ফেরার পথে হেলান বাজারে একটা চায়ের দোকানে বাবুল ঢুকে পড়েন। বাবুল সেই চায়ের দোকানদারকে মালা পরিয়ে দেন।

তারপর বাবুল‌ নিজেই চা বানিয়ে দোকানদার সহ উপস্থিত সবাইকে চা পান করান। বাবুল নিজের হাতে চা বানিয়ে খাওয়ালে তৃণমূল কর্মী সমর্থকরা তালি বাজাতে শুরু করেন।‌ প্রচুর উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
 
তবে ভোট প্রচারে ভগবানরাও কিন্তু আছেন। বিজেপির সমর্থকরা জগন্নাথ মন্দিরের দ্বৈতাপতির মমতার পক্ষে বলা বিবৃতির মোকাবিলা করতে আসরে নামিয়ে দিয়েছেন পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পূজারিকে।‌

এই নির্বাচনের ভোট-রঙ্গে সল্টলেক এলাকায় একটা আধ্যাত্মিক আয়োজনের ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে। সল্টলেকের এফ-ডি ব্লকের ময়দানে ১৭ থেকে ১৯-এ এপ্রিল শ্রীজগন্নাথ বিশ্বশান্তি মহাযজ্ঞ হচ্ছে। সেজন্য সল্টলেকের এফ-ডি ব্লকের ময়দানে বড় আয়োজন করা হচ্ছে। তিনদিন ধরে এটি চলবে। বলা হচ্ছে সেখানে দশ লাখ ভক্ত শামিল হবেন।
 
আপাতভাবে এর মধ্যে কোন রাজনীতি নেই। কোন রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা নেই। বলা হচ্ছে,  একতা আর আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষের জন্য এসব করা হয়েছে।

রাজাধিরাজ জগন্নাথ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট যাঁরা পুরী ধামের জগন্নাথ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত, তাঁরাই আয়োজক। শনিবার পুরী জগন্নাথ ধামের মুখ্য দৈতাপতি ভবানী দাস মহাপাত্র মহারাজ কলকাতার প্রেস ক্লাবে এসে সাংবাদিক বৈঠক করে এই আধ্যাত্মিক সমাবেশের কথা ঘোষণা করেছেন।

বলা হচ্ছে, প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে মহাপ্রভু জগন্নাথের বত্রিশটা রূপ দর্শন করা যাবে এই সভায়। বারবার তিনি বলেছেন, বিভিন্ন জায়গায় জগন্নাথের মন্দির হতে পারে, কিন্তু পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মাহাত্ম্য সম্পূর্ণ আলাদা। সে এক সনাতন পরম্পরা।‌
 
কার্যত দীঘার জগন্নাথ ধামের প্রতি অনাস্থাই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রেস কনফারেন্সে। প্রশ্ন উঠেছে, পুরীর জগন্নাথধামের পুরোহিতদের কলকাতা আগমন এও কী ভোট-রঙ্গের অঙ্গ?
 
তবে জগন্নাথদেবকে নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে ভেবেই হয়তো শশী পাঁজা বাগবাজারে জগন্নাথ মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়েছেন এবং তিনিও ‘জয় জগন্নাথ ধ্বনি দিয়ে ঘুরছেন‌ তাঁর এলাকায়। তবে শুধু ভোটের সময় নয়, শশী পাঁজা জগন্নাথদেবের পূজারী দীর্ঘদিনের । সেকথা এলাকার মানুষ বিলক্ষণ জানেন।
 
তবে নানান রকমের ভোট প্রচারের ভোট-রঙ্গে সাইকেল আজও খুব জনপ্রিয় বাহন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।‌ সোনারপুর দক্ষিণের তৃণমূল প্রার্থী লাভলি মৈত্র তো ‘সবুজসাথী’ সাইকেল নিয়ে গোটা এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
 
শুধু লাভলি নন, সাইকেল চালিয়ে ভোট প্রচারে তৃণমূল প্রার্থী তিলক চক্রবর্তীকে মহিষাদলে দেখা গেছে। তিনি রোদ্দুর এড়াতে মাথায় একটা সাদা টুপি পরে সাইকেল মিছিল বের করেছেন। আবার একইভাবে কলকাতা শহরে অনেকেই সাইকেল নিয়ে প্রচার করছেন।‌
 
তবে এত কলহ, এত বৈরিতা, এত সংঘাতের মধ্যেও যখন জলপাইগুড়ির রায়গঞ্জ কেন্দ্রে দেখা যায় যে, তৃণমূল এবং বিজেপির দুই মহিলা প্রার্থী হঠাৎ পথে দেখা হয়ে যাওয়ায় একজন আরেকজনকে আলিঙ্গন করছেন।

তখন মনে হয় যে, না। এখনও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের আচরণ ভোট-রঙ্গে দেখা যায় বৈকি।
উত্তপ্ত নির্বাচনী আবহেও সৌজন্যের রাজনীতি আজও বেঁচে আছে।‌
 
আবার একই রকম সৌজন্যের দৃশ্য দেখা গেছে কোচবিহারে। একটা ব্যতিক্রমী নজির কোচবিহার শহরেও দেখা গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে থাকলেও দুই শিবিরের নেতাদের মিলন হল। 

শনিবার কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অভিজিৎ দে ভৌমিক দুনম্বর ওয়ার্ডে প্রচারে বেরিয়েই আচমকা পৌঁছে গেলেন বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক নিখিল রঞ্জন দের বাড়িতে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িতে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ, শুভেচ্ছা বিনিময় স্বাভাবিক ভাবেই কৌতুহলও ছড়িয়েছে আবার প্রশংসায় ছড়িয়েছে। আর যাই হোক রাজনীতিতে সৌজন্যর মৃত্যু হওয়া ভোটের সময় ও কাঙ্ক্ষিত নয়।