উদ্দালক
অনেকদিন বাদে টানটান রবিবার। সকালে মুখ্যমন্ত্রীর পরপর টুইট। বিকেলে ভোট ঘোষণা। রাতে প্রশাসনিক শীর্ষকর্তা বদল। বাংলা ভোটের গ্রুপলিগের ম্যাচ চলেছে রবিবাসরীয় মধ্যরাত পর্যন্ত। তারপর সোম-সকালে নয় নয় করে আরও ৪ হেভিওয়েট পুলিশকর্তার বদলি করেছে নির্বাচন কমিশন। ভোটের মুখে এই বদল করে কমিশন বার্তা দিতে চাইছে, রাজ্য সরকারের পক্ষে থাকা প্রশাসনিক কর্তাদের দিয়ে ভোট হবে না। ভোট কারা দেয়? কারা নির্বাচন করে সরকার? কমিশনের বদলির সিদ্ধান্তে উদ্বাহু নৃত্যরত বিজেপি এখনও কি বুঝতে পারেনি, যে ভোট আমলা বদল করে জেতা যায় না। ভোটে জিততে গেলে সংগঠন, মেশিনারি, ও জনগনের অকুন্ঠ সমর্থন লাগে। ভোটে জিততে গেলে, দম লাগে। আমলা, পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী, পক্ষপাত দুষ্ট কমিশন, ভোটার তালিকায় জোর করে নাম বাদ দেওয়ার মতো কোনও কিছুই সরকার বদলাতে পারে না। এই সরল সত্য যত তাড়াতাড়ি বিজেপি বুঝতে পারবে, রাজনৈতিক পরিসরে তত তাড়াতাড়ি তারা লাভবান হবে।
গত তিনটি বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে শেষটিতে সবচেয়ে বেশি দফায় ভোট করিয়েছিল কমিশন। এসেছিল বিপুল কেন্দ্রীয় বাহিনী, অবজার্ভার থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় আধিকারীকদল। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গিয়েছে, আসনের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে বির্তমান রাজ্য সরকার। ফলে, দফা মডেল মখ থুবড়ে পড়েছে। তাই হয়ত এবার গোটা রাজ্যকে দুই ভাগে ভাগ করেছে কমিশন। একদিকে মূলত বিজেপি প্রভাবিত আসনগুলি, অন্যদিকে তৃণমূলের গড়। স্ট্র্যাটেজি বদল করা হয়েছে এসআইআরের প্রেক্ষিত মাথায় রেখেও। কিন্তু এত কিছুর পরেও, বঙ্গ বিজেপির অন্দরের খবর কেন্দ্রীয় স্তরের নেতাদের এখনই বাংলার নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন সরকার বদলের সম্ভাবনা ক্ষীণ। কেন? রাজনীতির ছাত্র হিসাবে মনে হয়, একমাত্র কারণ, সাংগঠনিক দুর্বলতা। পরিবর্তন যাত্রা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের মিটিং মিছিলে মানুষের আগ্রহের অভাব, এসআইআরের প্রত্যক্ষ পান্ডা হিসাবে বিজেপির থেকে মুখ ফেরানো বঙ্গ নেতাদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বাধ্য করেছে। তাই খড়কুটোর মতো, আমলা বদলে অন্তত গতবারের ফলটুকু ধরে রাখবার চেষ্টা করছে বিজেপি? দেড় মাসের মধ্য সেই চিত্র পরিষ্কার হবে।
বাংলার রাজিনীতিতে পোড় খাওয়া বাম নেতৃত্ব কিন্তু এইসব বদল নিয়ে বিশেষ ভাবিতই নয়। কারণ, বাংলার রাজনীতি বিজেপির থেকে তাদের কাছে অনেক বেশি স্পষ্ট ও অভিজ্ঞতালব্ধ। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও একান্তে বাম-যুব নের্তৃত্ব বা দীর্ঘদিনের রাজনীতিকরা এ কথা স্বীকার করছেন, শুধু ছাপ্পা দিয়ে বিধানসভা ভোটে দুশোর বেশি আসন পাওয়া যায় না। বিপুল জনসমর্থন না থাকলে, এই সরকার এতদিন এমন দাপট দেখাত না। কিন্তু, বিজেপির কিছু এঁচোড় পাকা নেতা এতেই সরকার বদলের গন্ধ পাচ্ছেন। এমন একটা ভাব, “এই তো! এবার সরকার বদল হয়েই গেল।” তাঁরা বুঝতেই চাইছেন না, আসলে সরকার বদলাতে লাগে জনসমর্থন। আমলা বদলে কোনও ভোট জেতা যায় না।
এই ঘটনা শুরু হয়েছিল রাজ্যপাল বদলের মধ্যে দিয়ে। হঠাৎ করে সি.ভি. আনন্দ বোসের পদত্যাগ এবং আর এন রবির আগমন বুঝিয়ে দিয়েছিল রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষস্তরের বদল অবশ্যম্ভাবী। সেই সম্ভাবনা নির্বাচনী আচরণবীধি চালু হওয়ার পরেই স্পষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু, এত করেও বিজেপি যদি হারে, যদি আগের থেকেও বিজেপির আসন কমে, তাহলে কী হতে পারে? প্রথমত, এটা আবারও প্রমাণ হয়ে যাবে গণতন্ত্রে জনসমর্থন ব্যাতিরেকে কোনও ভোটই জেতা যায় না। ভোটে জিততে গেলে মানুষের পাশে থাকতে হয়, পাঁচ বছর ধরে জনসংযোগ তৈরি করতে হয়, সুখে-দুঃখে সাড়া দিতে হয়। শুধু, বিভাজনের রাজনীতি আর উপর মহলের পরিবর্তন বিরোধীদের সাফল্য দিতে পারে না। বরং বিরোধী হতে হলে শিক্ষা নিতে হয় মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে। তিনিও ৩৪ বছরের বাম সরকার বদলাতে সক্ষম হয়েছিলেন, গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
হাতে আর মাস দেড়েক সময়। তারপরেই স্পষ্ট হয়ে যাবে ফের মুখ্যমন্ত্রী পদে মমতা বসবেন? নাকি সরকার বদল হবে? ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের উপায় নেই। কিন্তু, রাজ্য দখলের যে নীল নকশা বিজেপি তৈরি করেছে, তার বিশ্লেষণ তো করাই যায়। সেই পরীক্ষাতেই বিজেপির প্রশাসনিক অদল-বদলের পরিকল্পনাকে শিশুসুলভ বলেই মনে হচ্ছে। যাঁর রাতের ঘুম উড়ল ভোটার তালিকায় নাম থাকবে কিন তা নিয়ে, যাঁদের বাড়িতে হাঁড়ি চড়ল না গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে, যে সংখ্যালঘু আতঙ্কে এখনও দিন গুজরান করেন, যে বাঙালি বাইরের রাজ্য বাংলা বলার জন্য মার খান, পুলিশ বদলে তাদের ভোট নিজের পক্ষে টানতে পারবে না বিজেপি। বুথে বোতাম টেপার আগের মুহূর্তে সেই আক্রন্ত মানুষগুলির বারবার মনে পড়বে, সব ক্ষেত্রে পাশে ছিলেন মমতা। পাশে ছিল তৃণমূল। ফলে, ভোটের ফল যা হওয়ার তাইই হবে।
