আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বব্যাপী আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ভারতীয় রুপি তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দর ৯৫-এর ঘরও অতিক্রম করেছে। সোমবার দিনের পরবর্তী ভাগে টাকার মান কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও, বাজারে অস্থিরতা ছিল প্রবল। টাকার মান কমার পেছনে মূল কারণগুলো কী এবং আপনার পকেটকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হল।

টাকার মান কেন কমছে? মূল কারণগুলোর ব্যাখ্যা
টাকার মান কমার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হল অপরিশোধিত তেলের দামে লংজাম্প। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের (অপরিশোধিত তেল) দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে। যেহেতু ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের সিংহভাগই আমদানি করে, তাই তেলের দাম বাড়লে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পায় - যা রুপির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

একই সময়ে, মার্কিন ডলারের অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। 'নিরাপদ আশ্রয়স্থল' হিসেবে ডলারের চাহিদার সুবাদে 'ডলার সূচক' ১০০-এর ওপরে অবস্থান করছে। বিশ্বজুড়ে যখন ডলার আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন রুপির মতো উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাগুলোর মান সাধারণত দুর্বল হয়ে পড়ে।

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংকটের ফলে শেয়ার বাজারগুলোতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা দেখাচ্ছেন। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান অর্থনীতির বাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে তাদের অর্থ তুলে নেন। এর ফলে ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

সোমবার শেয়ার বাজারগুলোতে ব্যাপক বিক্রয়চাপ লক্ষ্য করা গিয়েছে। এদিন সেনসেক্স প্রায় ১,৭০০ পয়েন্ট এবং নিফটি প্রায় ৫০০ পয়েন্ট হারিয়েছে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এদিন নিট বিক্রেতার ভূমিকায় ছিলেন, যার ফলে ডলারের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

'মহাবীর জয়ন্তী' উপলক্ষে মঙ্গলবার শেয়ার বাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বন্ধ।

দুর্বল রুপির প্রভাব আপনার ওপর কীভাবে পড়ে?
টাকার মান কমে যাওয়াকে হয়তো একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমস্যা মনে হতে পারে, কিন্তু এটি সরাসরি আপনার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে থাকে।

আপনি যদি বিদেশে ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন কিংবা বিদেশে অর্থ পাঠাতে চান, তবে আপনার খরচ বেড়ে যাবে। টাকার মান দুর্বল হওয়ার অর্থ হল - সমপরিমাণ ডলার কেনার জন্য এখন আপনাকে আগের চেয়ে বেশি রুপি খরচ করতে হবে।

আমদানিকৃত পণ্যসামগ্রীর দাম বেড়ে যাবে। এর মধ্যে জ্বালানি তেল, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং এমনকি কিছু খাদ্যদ্রব্যও অন্তর্ভুক্ত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, এই পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দিতে পারে।

যদি অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং তেল কোম্পানিগুলো সেই বাড়তি খরচের বোঝা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন ও লজিস্টিক খাতের ওপর এবং শেষ পর্যন্ত তা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকেও প্রভাবিত করে।

আপনি যদি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে থাকেন, তবে বাজারে অস্থিরতা বেড়ে যেতে পারে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পুঁজি প্রত্যাহারের ফলে বাজারে তীব্র ওঠানামা দেখা দিতে পারে, যা স্বল্পমেয়াদে আপনার বিনিয়োগ পোর্টফোলিওকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে, একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আইটি এবং ওষুধ শিল্পের মতো যেসব খাত ডলারে আয় করে, তারা টাকার দুর্বল অবস্থানের কারণে লাভবান হতে পারে।

এখন আপনার কী করা উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রথম নিয়ম হল আতঙ্কিত না হওয়া। মুদ্রার ওঠানামা একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া এবং প্রায়শই তা পৃথিবীর নানা ঘটনাবলির সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। আপনি যদি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে থাকেন, তবে আপনার বিনিয়োগকে বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে রাখুন।

যারা বিদেশে ভ্রমণ বা পড়াশোনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য ডলারের পুরোটা একবারে না কিনে, তা ধাপে ধাপে কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই পদক্ষেপ খরচের গড় হারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

স্বল্পমেয়াদী অস্থিরতার ওপর ভিত্তি করে হুট করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আপনার আর্থিক লক্ষ্যগুলো যদি দীর্ঘমেয়াদী হয়, তবে মুদ্রার ওঠানামার কারণে আপনার বিনিয়োগ কৌশল পরিবর্তন করা উচিত নয়।

আপনি যদি আন্তর্জাতিক তহবিলে বিনিয়োগ করে থাকেন, তবে টাকার দুর্বল অবস্থান আপনার পক্ষেও কাজ করতে পারে। কারণ এর ফলে আপনার বিনিয়োগের মুনাফা বা 'রিটার্ন' মুদ্রার বিনিময় হারের সুবাদে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে?
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট-সহ বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে, ভারতের শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ভাণ্ডার অত্যধিক বাজার অস্থিরতা মোকাবিলার ক্ষেত্রে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এসবিআই রিসার্চের সর্বশেষ প্রতিবেদন ‘SBI Ecowrap’-এ বলা হয়েছে, “আমাদের বিশ্বাস, ৭০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অঙ্কের এই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যথেষ্ট শক্তিশালী। যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে টাকার মান ধরে রাখতে এবং ফাটকাবাজদের অপতৎপরতা রুখে দিতে সক্ষম।”