আজকাল ওয়েবডেস্ক: আপনার বাড়িতে যদি সোনার গয়না বা মুদ্রা এমনিই পড়ে থাকে, তবে সরকার শীঘ্রই সেগুলোকে কেবল ঘরে আটকে না রেখে কাজে লাগানোর একটি নতুন সুযোগ করে দিতে পারে। 'মানিকন্ট্রোল'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সংশোধিত 'গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিম' (জিএনএস) ঘোষণা করতে পারে। প্রস্তাবিত অন্যতম বড় পরিবর্তনটি হল, শুধুমাত্র ব্যাঙ্ক নয়, বরং গয়না ব্যবসায়ীদেরও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সোনা জমা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল ভারতীয় পরিবারগুলোতে এমনিই পড়ে থাকা হাজার হাজার টন সোনাকে কাজে লাগানো এবং একই সঙ্গে সোনা আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমান।
গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিম কী?
২০১৫ সালে চালু হওয়া এই গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিমের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে বাড়িতে সোনা জমিয়ে না রেখে ব্যাঙ্কে জমা রাখতে উৎসাহিত করা।
জমা রাখা সোনা পরীক্ষা ও গলিয়ে সোনার বারে রূপান্তর করা হয়। এর বিনিময়ে আমানতকারী সোনার মূল্যের ওপর সুদ পান এবং সোনার মালিকানাও তাদের কাছেই থাকে।
আমানতের মেয়াদ শেষ হলে, জমার ধরন অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা চাইলে সোনা অথবা তার সমপরিমাণ নগদ অর্থ ফেরৎ পেতে পারেন।
এর মূল ধারণাটি ছিল সহজ: প্রতি বছর আরও সোনা আমদানি করার পরিবর্তে, ভারতীয় পরিবারগুলোতে আগে থেকেই যে বিপুল পরিমাণ সোনা রয়েছে, তা-ই কাজে লাগানো যেতে পারে।
সরকার কেন এটি নতুন করে সাজাচ্ছে?
মূল প্রকল্পটি আসলে সেভাবে সফল হয়নি। মানিকন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে আনুমানিক ২৫,০০০ টন সোনা গচ্ছিত থাকলেও, প্রায় এক দশক পরেও মাত্র ৩৮ টন সোনা এই প্রকল্পের আওতায় আনা (মনিটাইজ) সম্ভব হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল যে, শুধুমাত্র ব্যাহ্কগুলোই এই সোনা জমা নেওয়ার অনুমতি পেয়েছিল।
প্রস্তাবিত সংস্কারের ফলে সারা দেশের গয়না ব্যবসায়ীরা "সংগ্রহকারী সহযোগী" হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সহজ করে তুলবে।
শিল্প ক্ষেত্রের কর্তাদের মতে, যদি পরিবারগুলোর কাছে থাকা সোনার মাত্র ৫ শতাংশও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, তবে তা অর্থনীতির জন্য প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের নগদ অর্থের জোগান দিতে পারে।
পুরানো প্রকল্পটি কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
'গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিম' বা সোনা নগদীকরণ প্রকল্পটি কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তবে তা আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। অনেক পরিবারই তাদের আবেগজড়িত বা ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন গয়না জমা দিতে অনিচ্ছুক ছিল, কারণ জমা দেওয়ার আগে সেই সোনা গলিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়।
পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং পুরনো পারিবারিক সোনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য কর-সংক্রান্ত তদন্ত বা জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল।
ব্যাঙ্কগুলোর জন্য এই প্রকল্পে খুব একটা বাণিজ্যিক সুবিধা ছিল না। অন্যদিকে, সরকারকে সুদের পাশাপাশি সোনার দাম বাড়ার ফলে সৃষ্ট বাড়তি খরচও বহন করতে হত, যা প্রকল্পটিকে ব্যয়বহুল করে তুলেছিল।
এবার কী পরিবর্তন হতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রস্তাবিত পরিবর্তনটি হল গ্রাহকদের জন্য সুবিধা বা সহজলভ্যতা। ব্যাঙ্কে যাওয়ার পরিবর্তে মানুষ হয়তো গয়না ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই তাদের সোনা জমা দিতে পারবেন, কারণ গ্রাহকদের সঙ্গে তাঁদের আগে থেকেই একটি আস্থার সম্পর্ক রয়েছে।
সংগ্রহ কেন্দ্রের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকলে প্রকল্পটি আরও সহজ হবে এবং এতে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে।
আমদানির ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন নাগরিকদের এক বছরের জন্য সোনা কেনা বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন, ঠিক তার পরপরই এই সংস্কারের উদ্যোগটি নেওয়া হল।
মানুষের ওপর এর প্রভাব কী পড়বে?
যদি এই সংস্কারকৃত প্রকল্পটি ঘোষণা করা হয়, তবে অব্যবহৃত সোনা কেবল লকারে ফেলে রাখার বাইরেও মানুষের কাছে আরেকটি বিকল্প তৈরি হবে।
কোনও আয় না করে সোনা ফেলে রাখার বদলে, আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তা থেকে সুদ বা মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।
তবে প্রকল্পটি কতটা জনপ্রিয় হবে, তা নির্ভর করবে এর চূড়ান্ত নিয়মাবলির ওপর। অনেক ভারতীয় পরিবারের কাছে সোনা কেবল একটি বিনিয়োগ নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি আবেগপূর্ণ সম্পদ। গয়না গলিয়ে ফেলা, নথিপত্র এবং সহজলভ্যতা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো যদি নতুন সংস্করণে দূর করা না হয়, তবে অনেক পরিবার হয়তো তাদের সোনা বাড়িতেই রেখে দেওয়াটা ভাল বলে মনে করবে।
আপাতত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংস্কার করা প্রকল্পের ঘোষণা করেনি। তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে, প্রায় এক দশক আগে চালু হওয়া 'গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিম'-এর ক্ষেত্রে এটিই হবে সবচেয়ে বড় সংস্কার।















