আজকাল ওয়েবডেস্ক: হুগলিতেই রয়েছে ঐতিহাসিক সিঙ্গুর। আন্দোলনের সেই ভূমি, যেখান থেকে লড়াইয়ের নবজন্ম পেয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ওপর কৃষিজমি আন্দোলনের এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু হুগলির আকাশ কখন যে সবুজ থেকে গেরুয়া হয়ে গেল, তা বুঝতেই পারলেন না প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। কারণ, আন্দোলনের জমি থেকে তিনি উঠে গিয়েছেন নবান্নের চোদ্দতলায়। আর তাঁর ভরসা যার উপর, তিনি বুঝতেই পারেননি বাংলার রাজনীতিতে কীভাবে তৃণমূল চলে, কীভাবে তার রাজনীতি চলে এসেছে। সেই কারণে অভিষেক মডেল সর্বস্তরে ব্যর্থ হয়েছে, প্রকাশ্যে না বললেও বিভিন্ন ব্যক্তিগত পরিসরে তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের নেতারা এই কথাই বলছেন।
এবারের বিধানসভা ভোটের ফল দেখলে বলা যায়, হুগলিতে গলা জলে ডুবে তৃণমূল! আসনের নিরিখে আগের বিধানসভা ভোটে যা ফল হয়েছিল, এবারে তার উল্টো ফল হয়েছে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ১৬টি আসন জিতেছে বিজেপি, আর মাত্র দু'টি জিতেছে তৃণমূল। কেন এমন হল? জেলার নেতৃত্বের সূত্রে কিন্তু বিভিন্ন স্তরের ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। হুগলির প্রাক্তন জেলা সভাপতি তপন দাশগুপ্ত থেকে শুরু করে প্রবীণ নেতা অসিত মজুমদার, সকলেই বলছেন, কোথাও যেন অঙ্ক মেলাতে ভুল করে ফেলেছে শীর্ষ নেতৃত্ব। কোথাও অতি-আত্মবিশ্বাস কাজ করেছে, কাজ করেছে ঔদ্ধত্য। আর সেই কারণেই ভোটের ফলে দেখা গিয়েছে, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
হুগলি তৃণমূলের অন্দরে আলোচিত হচ্ছে, হুগলি জেলার জেলা সভাপতি থাকাকালীন হুগলির মোট ১৮টি আসনের মধ্যে ১৬টি আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল। সব সংসদীয় আসন, সব পঞ্চায়েত সমিতি, পঞ্চায়েত তাঁর সময়েই দখলে এনেছিল ঘাসফুল শিবির। তারপর তপন দাশগুপ্তকে সরিয়ে দেওয়ার পর পঞ্চায়েত খালি হয়ে গিয়েছে, বিধানসভার আসনও গিয়েছে। এবারে ভরাডুবি হয়েছে। তপন দাশগুপ্তকে টিকিট না দেওয়ার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন হুগলির তৃণমূলের কর্মীরা। হুগলি জেলায় তৃণমূলের অবস্থা খুব খারাপ বলেও জানিয়েছেন তাঁরা। তপন দাশগুপ্ত অবশ্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, 'আমি আপাতত হুগলির জেলার মানুষের পাশে থেকে কাজ করছি, মানুষ হয়ে কোনও দল হয়ে নয়।' আর আগামী দিনে কী দল ছেড়ে দেবেন তিনি? উত্তরে তপন বলেছেন, 'আগামী দিনের কথা আগামী দিনেই বোঝা যাবে। পরবর্তীকালে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেব।'
হুগলির অন্য নেতা অবশ্য এতটা রাখঢাক করে কিছু বলছেন না। দীর্ঘদিন ধরেই অসিত মজুমদার খোলামেলা কথা বলার জন্য খ্যাত। ভোটের মুখে হুগলি কেন্দ্রে দেবাংশু ভট্টাচার্যের নাম প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা হওয়ার পরেই উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন অসিত। পরে অবশ্য বরফ গলে। দেবাংশু নিজে গিয়ে অসিতের সঙ্গে কথা বলেন। একসঙ্গে ভোটের ময়দানেও তাঁদের দেখা যায়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হুগলি কেন্দ্রে জিতেছেন সুবীর নাগ। ভোটের এই ফলাফলের পরে অবশ্য দেবাংশুকে মাঠে দেখা যায়নি, হুগলির রাস্তায় দেখা গিয়েছে অসিত মজুমদারকে। তিনি ভোট পরবর্তী হিংসার বিরুদ্ধে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে। সেই অসিত কড়া ভাষায় বলছেন, 'মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মানুষ অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্যের জবাব দিয়েছে। এরা মনে করত, এঁরাই আজীবন ক্ষমতায় থাকবে, আমরাই সব। সেখান থেকেই এর জন্ম। আর কেউ নেই, প্রতিবাদের কেউ নেই, এটা মানুষ ভাল চোখে নেয়নি। প্রার্থীপদ থেকে আমাকে বাদ দেওয়া শুধু নয়, এই যে ৭৪ জন জয়ী প্রার্থীকে এবারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হল, এটা এই বছর অন্তত ঠিক হয়নি।' তিনিও কি শিবির বদল করার কথা ভাবছেন, 'না! দলবদলের প্রশ্নই নেই। আমরা মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে ছিলাম, মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে আছি। তবে শীর্ষ নেতৃত্বকে একেবারে তৃণমূল স্তরের কর্মীদের কথা শুনতে হবে, মমতা ব্যানার্জিকে জেলার নেতৃত্বের কথা শুনতে হবে।'















