আজকাল ওয়েবডেস্ক: দেশ জুড়ে একের পর এক রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশি সন্দেহে নিগ্রহের ঘটনা বেড়ে চলায়  ভিন রাজ্যে কাজে যাওয়ার জন্য এবার 'পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট' বা পিসিসি নেওয়ার ঢল নামল মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে। বিগত কয়েক মাস ধরেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যে 'বাংলাদেশি' সন্দেহে পুলিশের কাছে হেনস্থা হতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের। কখনও তাঁদের ভাগ্যে জুটছে মারধর আবার কখনও 'বাংলাদেশি'  তকমা দিয়ে তাঁদের জোর করে বাংলাদেশে 'পুশব্যাক' করে দেওয়া হয়েছে।


বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা নিয়ে ইতিমধ্যে সরব হয়েছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। আগামী  ২৭ জুলাই রাজ্যের সমস্ত জেলায় 'ভাষা আন্দোলন' শুরু করতে চলেছে ঘাসফুল শিবির। যার সূচনা বীরভূম জেলা থেকে মুখ্যমন্ত্রী  মমতা ব্যানার্জী নিজেই করবেন বলে এখনও পর্যন্ত জানা গিয়েছে। 

আরও পড়ুন: হিজাব ছাড়া আর বাইরে বেরোতে পারবেন না মেয়েরা! বাংলাদেশে পোশাকে ‘তালিবানি ফতোয়া? রাগে ফুঁসছে পদ্মাপার

রাজ্যের শাসক দল পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে এসে দাঁড়ালেও ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে পুলিশি হেনস্থার হাত থেকে বাঁচতে জেলা পিসিসি পোর্টালে আবেদন জানিয়ে উপযুক্ত 'পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট' নিয়ে তবেই ভিন রাজ্যে কাজে যেতে চাইছেন মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকরা। 

প্রসঙ্গত, এতদিন পর্যন্ত দেশের বাইরে কাজ করতে যেতে, সেনাবাহিনীতে যোগদান করা কিংবা অন্য রাজ্যে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার মতো কিছু কাজের জন্য সাধারণত এই 'পুলিশ ক্লিয়ারেন্স  সার্টিফিকেটের' প্রয়োজন পড়ত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের মধ্যে ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়ার জন্য মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকরা ভরসা রাখছেন এই 'পুলিশ ক্লিয়ারেন্স  সার্টিফিকেটের' উপর।  বৈধ আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড এমনকি বাড়ি ঘরের দলিল থাকা সত্ত্বেও নিজের দেশের মধ্যেই নিজেদের ভারতীয় হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশে যথেষ্টই হতাশ এই জেলার পরিযায়ী শ্রমিকরা। 

মুর্শিদাবাদের লালগোলা ব্লকের পরিযায়ী শ্রমিক বেল্লাল শেখ জানান, 'বৈধ নথি থাকা সত্বেও নিজের দেশের মধ্যে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলি বলে ভিন রাজ্যে গিয়ে কাজ করতেও আমরা এখন ভয় পাচ্ছি। আবার এই রাজ্যে ১০০ দিনের কাজের টাকা বন্ধ করে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাই বাধ্য হয়ে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিতে হচ্ছে আমাদের।' তিনি আরও বলেন,' বাইরের রাজ্যে গিয়ে যাতে কোনওরকম হেনস্থার শিকার না হতে হয় তাই জেলা পুলিশের কাছ থেকে 'পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট' নেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা।' 

পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে ওড়িশায় কর্মরত মুর্শিদাবাদের ডোমকলের বাসিন্দা রিয়াজ খান বলেন, 'ওড়িশার স্থানীয় থানায় আমার আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড সমস্ত জমা দিয়েছি। কিন্তু তা সত্বেও সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি। মনে হয় যে কোনও মুহূর্তেই আমার উপর 'বাংলাদেশি' তকমা পড়ে যাবে। এই রাজ্যে অনেক বাংলাভাষী হেনস্থার শিকার হয়েছেন। তাই মুর্শিদাবাদের স্থানীয় থানা থেকে 'পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট' জোগাড় করার জন্য পিসিসি পোর্টালে আবেদন করেছি।'

এক কথায় বলতে গেলে এই 'পুলিশ ক্লিয়ারেন্স  সার্টিফিকেট' বা পিসিসি বর্তমানে দরিদ্র মানুষের 'লোকাল পাসপোর্টে' পরিণত হয়েছে। দেশের মধ্যে কাজ করতে গেলেও নিজের বৈধ ভারতীয় নথির পাশাপাশি এই 'পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের' উপর ভরসা রাখছেন অধিকাংশ পরিযায়ী শ্রমিক। 

জেলা পুলিশ সূত্রের খবর, প্রতিদিন গড়ে ১০০ -২০০টি আবেদন জমা পড়ছে পিসিসি পোর্টালে। এছাড়া চলতি বছরে প্রায় ১৩ হাজার আবেদন পড়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার পিসিসি পোর্টালে। যার মধ্যে অধিকাংশই পরিযায়ী শ্রমিক। মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (লালবাগ) রাসপ্রীত  সিং বলেন,' ভিন রাজ্য থেকে প্রায় ১০০ জন শ্রমিককে 'বাংলাদেশি' তকমা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের সবাইকেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। বাকি যে সমস্ত আবেদন এখনও জমা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।' 


এই বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বহরমপুর-মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন,' মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর নির্দেশে আগামী ২৭ জুলাই থেকে ভাষা আন্দোলনের নামব আমরা। পাশাপাশি ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের যেভাবে হেনস্থা হতে হচ্ছে তার বিরুদ্ধেও তৃণমূল কংগ্রেস আন্দোলন চালিয়ে যাবে। '