আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভোট পরবর্তী হিংসা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন কোনও ঘটনা নয়। প্রতিটি নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পরই কোথাও না কোথাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, হামলা, ভাঙচুর কিংবা ঘরছাড়া হওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা এবার সামনে এল পাঁচলা থেকে।
প্রায় আট বছর ঘরছাড়া থাকার পর অবশেষে নিজের বাড়িতে ফিরলেন প্রাক্তন তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য শেখ মুজিবর রহমান। অভিযোগ, কাটমানি এবং স্কুলের চাকরি বিক্রির নামে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে না পারায় তাঁর উপর অত্যাচার নেমে এসেছিল। শুধু তাই নয়, তাঁর বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটও করা হয় বলে দাবি করেছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর পাঁচলা গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন শেখ মুজিবর রহমান। তখন তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় নেতা হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই দলের অন্দরে তাঁর সঙ্গে মতবিরোধ শুরু হয় বলে অভিযোগ।
শেখ মুজিবর রহমানের দাবি, স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক তাঁর কাছ থেকে পঞ্চায়েতের বিভিন্ন কাজের বাবদ ২৫ শতাংশ কাটমানি দাবি করেছিলেন। পাশাপাশি, স্কুলে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলেও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন তিনি।
মুজিবরের অভিযোগ, তিনি এই সমস্ত আর্থিক দাবির বিরুদ্ধে সরব হওয়াতেই শুরু হয় চাপ। পঞ্চায়েত সদস্য হয়েও তাঁকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা হয় বলেও অভিযোগ।
এখানেই শেষ নয়, তাঁর দাবি পরবর্তীতে এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের মদতেই তাঁর বাড়িতে হামলা চালানো হয়। ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাটও হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রাণভয়ে পরিবার নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।
প্রায় আট বছর ধরে ঘরছাড়া জীবন কাটাতে হয়েছে শেখ মুজিবর রহমানকে। রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি আইএসএফ-এ যোগ দেন। কিন্তু দলবদল করেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। বরং পূর্বের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আবহ বজায় ছিল বলেই দাবি করেন তিনি। ফলে দীর্ঘদিন নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি।
তবে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে বলে স্থানীয় সূত্রের খবর। পাঁচলার বিজেপি নেতৃত্ব উদ্যোগ নিয়ে শেখ মুজিবর রহমানকে তাঁর নিজের বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন বলে জানা গিয়েছে। দীর্ঘ আট বছর পর নিজের ভিটেতে ফিরতে পেরে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মুজিবর। তিনি দাবি করেন, “আমি নিজের দল করেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম। তার জন্য আমাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এত বছর বাড়িছাড়া থাকতে হয়েছে। এখন আমি চাই আমার সঙ্গে যা হয়েছে, তার বিচার হোক।”
ঘরে ফেরার পর থেকেই নিজের উপর হওয়া অত্যাচারের বিচারের দাবি করতে শুরু করেছেন শেখ মুজিবর রহমান। তিনি প্রশাসনের কাছে সুরক্ষার দাবিও জানিয়েছেন বলে খবর। একই সঙ্গে অতীতের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে দীর্ঘদিন এলাকায় ফিরতে দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, যাঁর বিরুদ্ধে এই সমস্ত অভিযোগ উঠেছে, সেই স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক গুলশান মল্লিক যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “কোনও দিন আমি কারও কাছ থেকে কাটমানি চাইনি। স্কুলে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মুজিবর সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ করছেন।”
বিধায়কের দাবি, শেখ মুজিবর রহমান নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন এবং একাধিক অপরাধমূলক মামলায় অভিযুক্ত। দলের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রধান হওয়ার এক বছরের মধ্যেই বহিষ্কার করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। পরবর্তীতে আইএসএফ-এ যোগ দিলেও সেখান থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয় বলে মন্তব্য করেন গুলশান মল্লিক। বর্তমানে তিনি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলেও কটাক্ষ করেন বিধায়ক।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাঁচলার রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্যের গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে বিধায়কের সরাসরি অস্বীকার—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে। তবে দীর্ঘ আট বছর পর এক প্রাক্তন জনপ্রতিনিধির ঘরে ফেরা এবং তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় পাঁচলা।
















