আজকাল ওয়েবডেস্ক: তানজানিয়ার উদজুংওয়া পর্বতমালার ঘন রেইনফরেস্টে এক বিপুলাকায় প্রাচীন বৃক্ষ প্রজাতির আবিষ্কারে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে। নতুন এই বৃক্ষটির নাম দেওয়া হয়েছে Tessmannia princeps, যা হতে পারে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও দীর্ঘতম ক্রান্তীয় বৃক্ষ। গাছটির বয়স অনুমান করা হয়েছে প্রায় ৩,০০০ বছর, আর উচ্চতা এতটাই বেশি যে এটি ঘন কুয়াশা ও মেঘে প্রায় সব সময় ঢাকা থাকে।

২০১৯ সালে ইতালির ত্রেন্তোর মিউজ সায়েন্স মিউজিয়ামের উদ্ভিদবিদ আন্দ্রেয়া বিয়ানকি এবং স্থানীয় তানজানিয়ান বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা অভিযানে এই গাছটি প্রথম শনাক্ত হয়। ওই দলটি যখন উলুতি এবং বোমা লা মজিঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে উদ্ভিদ মানচিত্র তৈরির কাজ করছিলেন, তখন হঠাৎই এক বিশাল, ধূসর ছাল-ওয়ালা অচেনা গাছ তাঁদের চোখে পড়ে। স্থানীয় গাইডরাও গাছটি আগে কখনও দেখেননি।

পরবর্তী মাসগুলোতে চালানো অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয় যে, এই গাছটি বিজ্ঞানের কাছে একেবারেই নতুন এবং এখন পর্যন্ত কেবলমাত্র দুটি গভীর উপত্যকায় এর অস্তিত্ব মিলেছে — সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,২০০ থেকে ৫,০০০ ফুট উচ্চতায়। এই উপত্যকাগুলো এতটাই দুর্গম ও জনবিচ্ছিন্ন যে এই বিশালাকার বৃক্ষ এতদিন অজানাই থেকে গিয়েছিল। গবেষকরা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত গাছটির প্রায় ১০০টি প্রাপ্তবয়স্ক উদ্ভিদ শনাক্ত করা গেছে, যা অত্যন্ত কম এবং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, Tessmannia princeps শুধু যে আকার ও বয়সে বিরল, তা-ই নয়, এটি আশেপাশের জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল ও পরিবেশগত সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন: "হাকুনা মাতাতা"! ১৮ বোতল বিয়ার খেয়ে গরুর সঙ্গে 'মারামারি' শুওরের! রিয়েল লাইফ 'পুম্বা'র কাণ্ডে হাসির রোল নেট দুনিয়ায় 

এই গাছটির সংরক্ষণ নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। বনাঞ্চলের বিস্তার কমে যাওয়া, চাষের জমি বাড়ানোর প্রবণতা, এবং মাঝে মাঝেই ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড — এসবই গাছটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাছটি মূলত সুনির্দিষ্ট জলবায়ু ও উচ্চতাভিত্তিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে, ফলে আবাসস্থল নষ্ট হলে এটি আর কোথাও টিকে থাকার সুযোগ পাবে না। আন্দ্রেয়া বিয়ানকি বলেন, “এই আবিষ্কার কেবল একটি নতুন প্রজাতি চেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার ইঙ্গিত ল দেয়। আমরা এমন এক প্রজাতিকে সামনে পাচ্ছি, যা হাজার হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীতে বেঁচে রয়েছে—এটি একধরনের জীবন্ত ইতিহাস।”

তানজানিয়ান গবেষকরাও একমত যে, Tessmannia princeps আবিষ্কারের মাধ্যমে উদজুংওয়া পর্বতমালার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। এখানকার গভীর বনভূমিতে আজও অসংখ্য অজানা প্রজাতি লুকিয়ে থাকতে পারে। এই গাছটির জিনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, বৃদ্ধির গতি, বীজ সংরক্ষণযোগ্যতা ও কার্বন সংগ্রহ ক্ষমতা নিয়ে আরও গবেষণার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই বৈজ্ঞানিক সাফল্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির রহস্য আজও পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি। এবং সেই রহস্য রক্ষার দায়িত্বও আমাদেরই। মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান সম্ভব, যদি আমরা সম্মান ও সচেতনতা নিয়ে এগিয়ে চলি।