আজকাল ওয়েবডেস্ক: কলকাতা ময়দানে কিছু মানুষ শুধু কর্মকর্তা নন, তাঁরা এক-একটা যুগ।
স্বপনসাধন 'টুটু' বসু ছিলেন তেমনই এক নাম। যাঁকে ঘিরে গ্যালারির হৃদস্পন্দন বদলে যেত, ডার্বির আগে যাঁর একটি মন্তব্যই সমর্থকদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিত।

সেই টুটু বোস আর নেই। বেলভিউ হাসপাতালের সদাব্যস্ত করিডর পেরিয়ে তিনি চলে গেলেন এমন এক অনন্ত ময়দানে, যেখানে হয়তো আবার শিবদাস ভাদুড়ি, গোষ্ঠ পাল, চুনী গোস্বামীদের সঙ্গে সবুজ ঘাসের উপর বসে ফুটবলের গল্পে মেতে উঠবেন। 

আর এপারে, ময়দানের বাতাসে থেকে যাবে তাঁর দৃপ্তকণ্ঠের সেই দাপুটে মন্তব্য, ''আমার নাম টুটু বোস...।''

টুটু বোস এক মহাকাব্যের নাম। তাঁর জীবন ও কর্ম এতটাই বহুধা বিস্তৃত যে স্বল্প পরিসরে তাকে বেঁধে রাখা সত্যিই কঠিন। 

আবার মোহনবাগানের কোনও প্রশাসনিক পদ বা দায়িত্বের সীমারেখা দিয়ে এই মহাজীবনকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করাও সম্ভব নয়। 

তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি শুধুমাত্র পদ বা ক্ষমতার মাধ্যমে নয়, নিজের কাজের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং মানবিক আচরণের মধ্যে দিয়েই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। 

ক্লাবের প্রতিটি স্তরের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সহজ, আপন ও আন্তরিক। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার 'টুটুদা'। এই ডাকের মধ্যেই যেন মিশে গিয়েছিল তাঁর প্রতি মানুষের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালবাসা এবং নির্ভরতা। 

ইস্ট-মোহনের চিরকালীন মহারণের আগে তিনিই যেন বেঁধে দিতেন উত্তেজনার সুর। তাঁর একটি মন্তব্য, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ ম্যাচের আগের আবহকে বদলে দিত এক লহমায়। সেই সুরে এমন এক অদ্ভুত উদ্দীপনা থাকত, যা সমর্থকদের রক্তের গতি বাড়িয়ে দিত, গ্যালারির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে দিত আত্মবিশ্বাসের ফল্গুধারা। 

আট ও নয়ের দশকে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের ভয়ের কারণ কেবল মোহনবাগান ছিল না। ভয় ছিল আরও একজনকে নিয়ে। 

তিনি টুটু বোস।  দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সেই মানুষটা জানতেন, ফুটবল শুধু মাঠে খেলা হয় না। ফুটবল মাইন্ড গেমও বটে। অভিজ্ঞতার কলস পরিপূর্ণ তাঁর। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বুঝতেন, বড় ম্যাচের আগে সমর্থকের বুকের ভিতরে আগুনের ফুলকি জ্বালিয়ে দিতে পারলেই অর্ধেক লড়াই জিতে নেওয়া যাবে। 

যুবভারতীর সেই ডার্বির গল্প আজও ময়দানের লোকগাথায় স্থান পাবে। খেলার দিন দুয়েক আগে তাঁর গর্জন, 'বাঙালদের দেখে নেব'--মোহনবাগান গ্যালারিকে যেন বিদ্যুৎতারিত করেছিল। মাঠে নামার আগেই তিনি সমর্থকদের মনে জয়ের ছবি এঁকে দিয়েছিলেন। মোহনবাগানের হয়ে সেই বড় ম্যাচে গোল করেছিলেন শিশির ঘোষ। গ্যালারির উন্মাদনা আর ম্যাচশেষে টুটুবাবুকে ঘিরে বিজয়োৎসব, সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমর্থকদের কাছে এক অদ্ভুত মানসিক শক্তির নাম। 

তিনি ছিলেন সেই কর্তা, যিনি শুধু ফুটবলার কিনতেন না, আসলে তিনি স্বপ্ন কিনতেন। তাঁর স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতেন অগুনতি মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে। মোহনবাগানের প্রথা ভেঙে 
বিদেশি চিমা ওকেরিকে বাগানে আনা, কৃশানু-বিকাশকে সই করানো,  মনোরঞ্জনকে সবুজ-মেরুনে খেলানো, ব্যারেটোর জন্য উজাড় করে দেওয়া, সনি নর্দেকে নিয়ে আসা মোহনবাগানে, সবকিছুর মধ্যেই ছিল তাঁর একটাই পরিচয়--সবার আগে মোহনবাগান। তিনি শুধু ক্লাব কর্তা নন। তিনি মোহনবাগান রত্ন।  
ক্লাবের বিপদে নিজের অর্থ ঢেলে দিয়েছেন নির্দ্বিধায়।

জরিমানার কোটি টাকা দিয়েছেন নিজের ঘর থেকে। যখনই মোহনবাগান আর্থিক সমস্যায় ভুগেছে, তখনই ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে এসেছেন টুটু বোস। তাঁর ও বন্ধু অঞ্জন মিত্রর জুটি ভোলার নয়।  
টুটু বোসের কাছে মোহনবাগান কোনও প্রতিষ্ঠান ছিল না, ছিল প্রথম প্রেম। 

মোহনবাগান তাঁর রক্তে। তাঁর নেশায়। তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসে। তিনি ছিলেন গ্যালারির আস্থার এক অন্য নাম। কখনও তাঁর মন্তব্য নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, আবার তিনিই অর্থসঙ্কটে ভুগতে থাকা কিংবদন্তি কান্ননের জন্য আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছিলেন। 

টুটু বোস একদিকে সফল ব্যবসায়ী, অন্যদিকে আবেগপ্রবণ ফুটবলপ্রেমী। এই বিরল সমীকরণ খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়।
 'সংবাদ প্রতিদিন'-কে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া মানুষটি সংবাদজগতেও নিজের ছাপ রেখেছিলেন। কণ্টকাকীর্ণ পথেও তিনি  ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছেন পাপরি। 

রাজ্যসভাতে গিয়েছেন। রাজনীতির শীর্ষমহল থেকে শিল্প, সাহিত্য থেকে  সিনেমা, এক ডাকে তাঁকে সবাই চিনতেন। সব জায়গাতেই ছিল তাঁর অনায়াস পদচারণা। তাঁর আত্মজীবনী—শূন্য থেকে শুরু।
এই তিনটি শব্দের ভিতরেই যেন লেখা ছিল এক লড়াকু মানুষের সম্পূর্ণ জীবনকাব্য।

একদিন সত্যিই শূন্য হাতেই পথ চলা শুরু করেছিলেন তিনি। তারপর অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সাহস, স্বপ্ন আর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে ধীরে ধীরে পৌঁছে গিয়েছিলেন সাফল্যের এমন এক আকাশে, যেখানে খুব কম মানুষই পৌঁছতে পারেন।
মাটির কাছ থেকে উঠে এসে তিনি নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্ত এক উচ্চতায়। তবু হৃদয়ের ভিতর সারাজীবন আগলে রেখেছিলেন ময়দানের সবুজ ঘাসের গন্ধ আর এক মোহন সমর্থকের এক বুক আবেগ।

তিনি ছিলেন দূরদর্শীও। যখন বিদেশি ফুটবলার আনার সিদ্ধান্তে অনেকেই বিরোধিতা করেছিলেন, তখন তিনি ভবিষ্যৎ পড়ে ফেলেছিলেন অনেক আগেই। যখন কর্পোরেট অংশীদারিত্ব নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল, তখনও তিনি ছিলেন সময়ের আগেই।

আজ মোহনবাগান ভারতসেরা। তার শিকড় প্রথিত হয়েছিল টুটু বোসের হাত ধরেই। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখেননি।

নিজের হাতে তৈরি নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন। সভাপতির পদ ছেড়ে দিয়েছেন হাসিমুখে।
ত্যাগের মধ্যেও তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন। নেতৃত্বের সহজ পাঠ শিখিয়ে গিয়েছেন সবার শ্রদ্ধার টুটু বাবু। 

আজ ময়দান বিষণ্ণ।  সবুজ-মেরুন গ্যালারি-সহ সর্বত্র এক শূন্যতা। কিছু মানুষ চলে গেলে শুধু চারদিক যে শূন্য হয়ে যায়, তা নয়। একটা যুগেরও যেন সমাপ্তি হয়। টুটু বোস তেমনই এক যুগের নাম।

এগিয়ে আসছে চিরআবেগের ডার্বি। তিনি আজ নেই। কিন্তু কোথায় যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাঁর অমোঘ কণ্ঠস্বর। ঘুরে ফিরে আসছে খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করার আখ্যান। 

মোহনবাগানের সবুজ ঘাসে, সারা দেশের মাঠ-ময়দানে টুটু বোস লিখে রেখে গিয়েছেন অসংখ্য রূপকথা। মানুষের মৃত্যু হয়, রূপকথার অন্ত নেই, তার বিনাশ নেই। জীবনের সঙ্গে তা মিশে জীবনের গল্প হয়েই থেকে যায়।